২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপে আফ্রিকান দলগুলোর পারফরম্যান্স: অর্জন ও শিক্ষার খতিয়ান
২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপে আফ্রিকা মহাদেশ থেকে তাদের ইতিহাসের বৃহত্তম দল অংশ নেয়। এই টুর্নামেন্টে বেশ কিছু চমৎকার গল্প উঠে এলেও, অংশগ্রহণকারী ১০টি দলের সামগ্রিক সাফল্য কতটা ছিল তা নিয়ে এখন বিশ্লেষণ চলছে।
নয়টি আফ্রিকান দেশ নকআউট পর্বে জায়গা করে নেওয়ার পর কনফেডারেশন অফ আফ্রিকান ফুটবল (Caf)-এর প্রধান প্যাট্রিস মোৎসেপে মন্তব্য করেন যে, তারা মহাদেশের ১৬০ কোটি মানুষকে গর্বিত করেছে। তবে শুধুমাত্র মরক্কো কোয়ার্টার ফাইনাল পর্যন্ত পৌঁছাতে পেরেছে। এছাড়া, শেষ মুহূর্তে গোল হজম করে বিদায় নেওয়ার বিষয়টি পাঁচটি দলের ক্ষেত্রে বারবার ঘটেছে। বিশেষ করে সেনেগাল ও মিশর দুই গোলের লিড নিয়েও নাটকীয়ভাবে টুর্নামেন্ট থেকে ছিটকে পড়েছে।
অন্যদিকে, মিশর এবং ডিআর কঙ্গো অন্তত বিশ্বকাপে নিজেদের প্রথম জয়ের স্বাদ পেয়েছে। সেই সঙ্গে কেপ ভার্দে, আইভরি কোস্ট এবং দক্ষিণ আফ্রিকা প্রথমবারের মতো গ্রুপ পর্ব পার করার গৌরব অর্জন করেছে। ২০৩০ সালে মরক্কো, স্পেন ও পর্তুগালের সঙ্গে যৌথভাবে বিশ্বকাপ আয়োজন করবে। এই প্রেক্ষাপটে ৪৮ দলের প্রথম টুর্নামেন্ট থেকে আফ্রিকান দলগুলো কী শিখতে পারল, তা এখন বড় আলোচনার বিষয়।
আন্ডারডগদের জয়জয়কার
কেপ ভার্দে ছিল এই বিশ্বকাপের অন্যতম বড় চমক। প্রথমবারের মতো অংশগ্রহণ করেই তারা স্পেন, উরুগুয়ে এবং সৌদি আরবের সঙ্গে ড্র করে শেষ ৩২-এ জায়গা করে নেয়। এরপর ডিফেন্ডিং চ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনার বিপক্ষেও দুর্দান্ত লড়াই চালায় ‘ব্লু শার্কস’রা। তারা দুইবার পিছিয়ে পড়েও সমতায় ফিরেছিল, যদিও শেষ পর্যন্ত অতিরিক্ত সময়ের পর ৩-২ ব্যবধানে হেরে বিদায় নিতে হয়।
গোলরক্ষক ভোজিনহার প্রতিটি সেভ তাকে ভাইরাল করে তোলে। টুর্নামেন্ট শেষে ইনস্টাগ্রামে তার অনুসারীর সংখ্যা ৫০ হাজার থেকে বেড়ে ২ কোটি ৯০ লাখে দাঁড়ায়। ৪০ বছর বয়সী এই গোলরক্ষকের জনপ্রিয়তা এতটাই তুঙ্গে ওঠে যে, তার নামে একটি নতুন প্রজাতির সামুদ্রিক স্লাগের নামকরণও করা হয়েছে। রক্ষণভাগের খেলোয়াড় রবার্তো ‘পিকো’ লোপেস বিবিসি স্পোর্টকে বলেন, “আমরা বিশ্বের সেরা দলগুলোর সঙ্গে পাল্লা দেওয়ার ক্ষমতা রাখি। আমরা ছোট দেশ হতে পারি, কিন্তু আমাদের হৃদয়ের সাহস বিশাল।”
আটলাস লায়নদের আধিপত্য
মরক্কো মহাদেশের শীর্ষ দল হিসেবে নিজেদের অবস্থান আরও শক্তিশালী করেছে। তারা প্রথম আফ্রিকান দল হিসেবে টানা দুই বিশ্বকাপে কোয়ার্টার ফাইনালে খেলার কৃতিত্ব দেখিয়েছে। তবে কাতার ২০২২-এর মতো এবারও ফ্রান্সের কাছে হেরেই তাদের বিদায় নিতে হয়। কোচ মোহামেদ ওহাবির অধীনে দলটি বেশ আক্রমণাত্মক ফুটবল খেলেছে। বিশেষ করে ১৮ বছর বয়সী মিডফিল্ডার আইয়ুব বৌয়াদি নজর কেড়েছেন। ওহাবি বলেন, “আমাদের একটি তরুণ দল আছে যারা প্রতিনিয়ত উন্নতি করছে। এই প্রতিভাবান খেলোয়াড়রাই আমাদের ভবিষ্যতের ভিত্তি।”
শেষ মুহূর্তের গোলের যন্ত্রণা
টুর্নামেন্টের আগে ইমানুয়েল এবুয়ে সতর্ক করেছিলেন যে, মনোযোগের অভাবে আফ্রিকান দলগুলো শেষ মুহূর্তে গোল হজম করতে পারে। ডিআর কঙ্গো এবং আইভরি কোস্ট ৮৬তম মিনিটে গোল খেয়ে নকআউট পর্ব থেকে ছিটকে পড়ে। এছাড়া দক্ষিণ আফ্রিকাকে বিদায় নিতে হয়েছে কানাডার বিপক্ষে ইনজুরি টাইমের গোল হজম করে।
সেনেগাল ও মিশরও দুই গোলের লিড ধরে রাখতে পারেনি। সেনেগাল বেলজিয়ামের বিপক্ষে শেষ মুহূর্তে গোল খেয়ে ম্যাচ হাতছাড়া করে এবং ১২৫তম মিনিটে পেনাল্টি থেকে গোল হজম করে পরাজিত হয়। মিশরের বিদায় ঘটে এনজো ফার্নান্দেজের ৯২তম মিনিটের হেডে। কোভেন্ট্রি ইউনিভার্সিটির স্পোর্টস সাইকোলজিস্ট ড. নিকিতা রাউলি বলেন, “এটি কোনো ট্রেন্ড নয়, বরং দুর্ভাগ্যের বিষয়। বড় ম্যাচে শারীরিক ও মানসিক ক্লান্তির কারণে খেলোয়াড়রা শেষ সময়ে ভুল করে বসে। ইতিহাস গড়ার আকাঙ্ক্ষা অনেক সময় মানসিক চাপ বাড়িয়ে দেয়।”
একটি শিক্ষণীয় অধ্যায়
বিশ্বকাপে আফ্রিকান দলের সংখ্যা ৫ থেকে বেড়ে ৯টি হওয়া মহাদেশটির জন্য আশীর্বাদ হিসেবে এসেছে। তিউনিসিয়া ছাড়া অন্য সব দলই গ্রুপ পর্ব পার করেছে। ফিফা ট্যালেন্ট আইডি বিশেষজ্ঞ মাটার এম’বোগে বলেন, “আফ্রিকান দলগুলোর খেলোয়াড়রা এই উচ্চ পর্যায়ের ম্যাচে খুব একটা অভ্যস্ত নয়। ইউরোপ ও দক্ষিণ আমেরিকার দলগুলো নিয়মিত বড় টুর্নামেন্টে খেলার অভিজ্ঞতা থেকে বাড়তি সুবিধা পায়। তবে আমাদেরও অভিজ্ঞতা বাড়ছে।”
কার্থেজ ঈগলদের হতাশাজনক টুর্নামেন্ট
তিউনিসিয়ার পারফরম্যান্স ছিল সবচেয়ে হতাশাজনক। প্রথম ম্যাচে সুইডেনের কাছে ৫-১ গোলে হারের পর তারা কোচ সাবরি লামুচিকে বরখাস্ত করে এবং হার্ভ রেনারকে নিয়োগ দেয়। কিন্তু তাতেও পরিস্থিতির কোনো উন্নতি হয়নি। অন্যদিকে ঘানাও নকআউট পর্বে পৌঁছালেও তাদের খেলার মান নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। তারা মাত্র চারটি ম্যাচে মোট চারটি শট লক্ষ্যে রাখতে পেরেছে এবং গোল করার ক্ষেত্রে বেশ পিছিয়ে ছিল।
মাঠের বাইরের সমস্যা
টুর্নামেন্টের মাঠের লড়াইয়ের পাশাপাশি ভিসা সংক্রান্ত জটিলতায় ভুগতে হয়েছে আফ্রিকানদের। আইভরি কোস্ট ও সেনেগালের সমর্থকদের অনেক ক্ষেত্রে ভিসা পেতে বাধা দেওয়া হয়েছে। এছাড়া আলজেরিয়া, কেপ ভার্দে ও তিউনিসিয়ার নাগরিকদের জন্য ১৫ হাজার ডলার পর্যন্ত জামানত জমার নিয়ম আরোপ করা হয়েছিল। সোমালিয়ার রেফারি ওমর আরতানকে সঠিক কাগজপত্র থাকা সত্ত্বেও টুর্নামেন্টে প্রবেশ করতে দেওয়া হয়নি, যা ফিফাকে বড় ধরনের সমালোচনার মুখে ফেলে। এরপরও ৪৮ দলের বিশ্বকাপ সফল হওয়ায় ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনো এখন ৬৪ দলের বিশ্বকাপ আয়োজনের পরিকল্পনা করছেন, যা ভবিষ্যতে আফ্রিকার জন্য আরও বেশি সুযোগ নিয়ে আসতে পারে। তবে মহাদেশটির ফুটবলের উন্নতিতে দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনার প্রয়োজন এখনো অপরিসীম।
