বিশ্বকাপের তৃতীয় স্থান নির্ধারণী ম্যাচ কেন অকার্যকর ও অপ্রয়োজনীয়?
প্রতি চার বছর অন্তর আয়োজিত বিশ্বকাপ ফুটবলের আকর্ষণ ও উন্মাদনা অতুলনীয়। এই টুর্নামেন্ট দর্শকদের মনে নাটকীয়তা ও উত্তেজনার জন্ম দেয়। কিন্তু এত বড় আয়োজনের পরেও সেমিফাইনালের পর অনুষ্ঠিত তৃতীয় স্থান নির্ধারণী ম্যাচ নিয়ে খেলোয়াড়, ভক্ত কিংবা সম্প্রচারকারী—কারও তেমন আগ্রহ থাকে না।
এই ম্যাচটির অসারতা প্রমাণের জন্য এটিকে এবারের আসরে “ব্রোঞ্জ ফাইনাল” নাম দেওয়া হয়েছে। রাগবি ইউনিয়নের অন্যতম বিখ্যাত কোচ এই ম্যাচের প্রতি উপহাস প্রকাশ করতে গিয়ে বলেছিলেন, সেমিফাইনালে হারের পর ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ওয়েলসের কোচ ওয়ারেন গ্যাটল্যান্ডের প্ররোচনামূলক মন্তব্য নিয়ে সাংবাদিকরা প্রশ্ন তুললে এডি জোনস বলেছিলেন, “ওয়ারেনকে আমার শুভেচ্ছা জানাবেন এবং নিশ্চিত করবেন যেন সে তৃতীয়-চতুর্থ স্থান নির্ধারণী ম্যাচটি উপভোগ করে।” মজার ব্যাপার হলো, সেই ম্যাচে ওয়েলস নিউজিল্যান্ডের কাছে ২৩ পয়েন্টে হেরেছিল এবং সেটি নিয়ে কারো তেমন মাথাব্যথা ছিল না।
ফুটবল বা রাগবি, যে খেলাতেই হোক না কেন, এই ম্যাচ নিয়ে ব্যঙ্গ করার সুযোগ রয়েই গেছে। আর্জেন্টিনা কাছে সেমিফাইনালে হারার তিন দিন পর ইংল্যান্ডের বিধ্বস্ত দল এখন ফ্রান্সের মুখোমুখি হবে। কোচ টমাস টুখেল তার ক্লান্ত খেলোয়াড়দের এই ম্যাচটির জন্য অনুপ্রাণিত করার চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি।
টুখেল সাংবাদিকদের বলেন, “আমাদের বা ফ্রান্সের কোনো খেলোয়াড়ই এই ম্যাচটি খেলতে চায় না। সবাই শিরোপা জিততে চায়, কিন্তু বাস্তবতা এটাই। ফ্রান্সের চেয়ে আমাদের হাতে পুনরুদ্ধারের জন্য একদিন সময় কম, তবুও আমরা পেশাদারিত্বের সঙ্গেই ম্যাচটি খেলব।”
বিশ্বকাপের ইতিহাসে ১০৪টি ম্যাচের মধ্যে ১০৩তম ম্যাচটি বর্তমান আধুনিক ফুটবলে এক চরম অযৌক্তিক ঘটনা। দীর্ঘ মৌসুম ও পাঁচ সপ্তাহের টুর্নামেন্ট শেষে মায়ামিতে শনিবারের এই ম্যাচটি মূলত অভিজাত ক্রীড়াঙ্গনে এক অকার্যকর লড়াই।
গ্রুপ পর্বে গোল পার্থক্যের পরিবর্তে হেড-টু-হেড নিয়ম রাখা নিয়ে ফিফার সমালোচনা হয়েছিল, যা অনেক ম্যাচকে গুরুত্বহীন করে তুলেছিল। তবে এখানে ক্লান্ত শরীর ও মনের ওপর খেলোয়াড়দের চোট বা অবসাদের ঝুঁকি স্পষ্ট।
টমাস টুখেলকে তৃতীয় স্থান নির্ধারণী ম্যাচের জন্য দল গোছাতে হচ্ছে।
২০১৪ সালে নেদারল্যান্ডসের তৎকালীন কোচ লুই ফন গাল বলেছিলেন, “আমার মনে হয় এই ম্যাচটি কখনোই খেলা উচিত নয়, আমি ১০ বছর ধরে এই কথা বলছি… এটি অন্যায়।” এরপর নেদারল্যান্ডস ব্রাজিলকে ৩-০ গোলে হারিয়ে তৃতীয় হয়েছিল, কিন্তু তাতে কারোরই তেমন আগ্রহ ছিল না।
১৯৩৪ সালে বিশ্বকাপ ফুটবলে তৃতীয় স্থান নির্ধারণী ম্যাচ চালু হয় এবং ১৯৫৪ সাল থেকে প্রতি আসরেই এটি অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে। বিপরীতে, ১৯৮০ সালে ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপ থেকে উয়েফা এই ম্যাচের ধারণা বাদ দিয়েছে। অথচ বিশ্বকাপে এই ম্যাচের তেমন চাহিদাও কেউ অনুভব করে না।
খেলোয়াড়রা ক্লান্ত থাকায় কোচরা সাধারণত দ্বিতীয় সারির খেলোয়াড়দের মাঠে নামান। তাই এটিকে বিশ্বকাপের চেয়ে প্রাক-মৌসুম প্রস্তুতি ম্যাচ বলেই মনে হয়। এছাড়া এই ম্যাচগুলোতে গোল উৎসবের সম্ভাবনা বেশি থাকে, যা মূলত প্রতিযোগিতার অসারতাকেই ফুটিয়ে তোলে।
লুই ফন গাল ২০১৪ সালে ব্রোঞ্জ পদকের ম্যাচের সমালোচনা করেছিলেন।
১৯৫৮ সালে ফ্রান্সের ফনটেইন পশ্চিম জার্মানির বিপক্ষে ৬-৩ গোলের জয়ে চারটি গোল করে বিশ্বকাপে এক আসরে ১৩ গোলের রেকর্ড গড়েছিলেন। কিলিয়ান এমবাপ্পে গোল্ডেন বুট জেতার দৌড়ে থাকায় শনিবারে বিধ্বস্ত ইংল্যান্ডের বিপক্ষে তার আরও গোল করার সুযোগ রয়েছে। তবে এটি যথাযথ কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়।
ছোট দেশগুলোর জন্য এই ম্যাচটির গুরুত্ব থাকলেও, বড় দলগুলোর জন্য এটি একেবারেই অপ্রাসঙ্গিক। ইংল্যান্ডের ২০১৮ সালের বেলজিয়ামের কাছে ২-০ বা ১৯৯০ সালে ইতালির কাছে ২-১ গোলের হার কি কেউ মনে রেখেছেন বা গুরুত্ব দিয়েছেন?
এমনকি সম্প্রচারকারী চ্যানেলগুলোও এই ম্যাচ নিয়ে খুব একটা আগ্রহী নয়। বিবিসিতে এই ম্যাচের জন্য উপস্থাপনার দায়িত্বে চতুর্থ সারির কাউকে রাখা এবং মাত্র আধা ঘণ্টার প্রাক-ম্যাচ বিশ্লেষণই প্রমাণ করে যে আয়োজকরাও বিষয়টিকে গুরুত্ব দিচ্ছে না।
২০১৮ সালে ইংল্যান্ড তৃতীয় স্থান নির্ধারণী ম্যাচে হেরেছিল।
অলিম্পিকের ব্রোঞ্জ পদকের মতো এখানে তেমন কোনো মাহাত্ম্য নেই। বিশ্বকাপে চ্যাম্পিয়ন হওয়ার চেয়ে বড় কোনো প্রাপ্তি নেই। তাই ফুটবলের এই অপ্রয়োজনীয় ম্যাচটি বন্ধ করা উচিত ফিফার। কারণ সহজ কথায়, এই ম্যাচ নিয়ে কেউই তেমন আগ্রহী নন।
