ফুটবল মাঠে আবারও মুখোমুখি ছাত্র ও শিক্ষক: লুইস দে লা ফুয়েন্তে ও লিওনেল স্কালোনি
শিক্ষকের মুখোমুখি ছাত্র।
বিশ্বকাপ ফাইনাল খেলতে নিউজিল্যান্ডে পৌঁছেছেন স্পেনের কোচ লুইস দে লা ফুয়েন্তে এবং আর্জেন্টিনার কোচ লিওনেল স্কালোনি। দুজনের যাত্রাপথ ভিন্ন হলেও একটি জায়গায় তারা অবিচ্ছেদ্যভাবে জড়িয়ে আছেন।
২০১৭ সালে স্কালোনি যখন খেলোয়াড়ি জীবন শেষে কোচিং নিয়ে অনিশ্চয়তায় ছিলেন, তখন তিনি স্প্যানিশ ফেডারেশনে উয়েফা প্রো লাইসেন্সের জন্য ভর্তি হন। এটি ইউরোপীয় ফুটবলের সর্বোচ্চ কোচিং ডিগ্রি।
সেখানেই প্রথম দেখা হয় দে লা ফুয়েন্তের সঙ্গে। সেই সময় তিনি টেকনিক্যাল মডিউলের শিক্ষক ছিলেন এবং একই সঙ্গে স্পেনের অনূর্ধ্ব-১৯ দলের দায়িত্ব পালন করছিলেন।
স্কালোনি তার ব্যাচের অন্যতম সেরা নম্বর নিয়ে কোর্সটি শেষ করেন। তিনি পরে জানিয়েছিলেন, দে লা ফুয়েন্তে তাকে ও তার সহপাঠীদের প্রচুর সাহায্য করেছিলেন। সেই থেকে দুজনের মধ্যে এক বিশেষ বন্ধন তৈরি হয়।
দে লা ফুয়েন্তে প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর মধ্য দিয়ে উঠে আসা মানুষ, আর স্কালোনি গড়ে উঠেছেন আর্জেন্টাইন ফুটবল সংস্কৃতি ও ড্রেসিংরুমের আবহে। তবুও তাদের মধ্যে অনেক মিল রয়েছে।
দুজনই এমন এক সময়ে জাতীয় দলের কোচ হয়েছিলেন যখন ফুটবল জগৎ তাদের অনেকটা ভুলে গিয়েছিল। দুজনেই এমন দল গড়েছেন যা পরিবারের মতো কাজ করে। তাদের মূল্যবোধ খেলাধুলার পাশাপাশি তাদের ব্যক্তিগত বিশ্বাসের সঙ্গেও গভীর ভাবে সম্পর্কিত।
দে লা ফুয়েন্তে একই সঙ্গে বিশ্বকাপ জয়ী ও ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়ন হওয়ার স্বপ্ন দেখছেন। অন্যদিকে স্কালোনি তার বিশ্ব জয়ের খেতাব ধরে রাখার লড়াই থেকে মাত্র ৯০ মিনিট দূরে।
শীর্ষ কোনো ক্লাবের কোচিং করানোর অভিজ্ঞতা ছাড়াই এই দুই কোচের অর্জন বেশ প্রশংসনীয়।
লুইস দে লা ফুয়েন্তে এবং লিওনেল স্কালোনি কেউই শীর্ষ পর্যায়ের ক্লাবের কোচ হিসেবে কাজ করেননি [গেটি ইমেজেস]
দে লা ফুয়েন্তের ফুটবলে টিকে থাকার গল্প
স্পেনের কোচ দে লা ফুয়েন্তে লা রিওজার হারো শহরে বেড়ে ওঠেন। ১৯৯৪ সালে খেলোয়াড়ি জীবন শেষ করার পর তিনি ১৫ বছর বিভিন্ন ক্লাবে কোচিং ও সহকারী কোচের দায়িত্ব পালন করেন।
২০১১ সালে দেপোর্তিভো আলাভেস থেকে বরখাস্ত হওয়ার পর ১৮ মাস তিনি ফুটবলের বাইরে ছিলেন। এরপর খবরের কাগজে একটি বিজ্ঞাপন দেখে স্প্যানিশ ফেডারেশনে যুব দলের কোচ হওয়ার আবেদন করেন।
সাবেক স্পেন কোচ ইনাকি সায়েজ তাকে ফেডারেশনের জন্য যোগ্য ব্যক্তি হিসেবে সুপারিশ করেন। তিনি অনূর্ধ্ব-১৯ দলকে ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপে নিয়ে যাওয়ার দায়িত্ব পান।
সেমিফাইনালে ফ্রান্সের কাছে হারলেও তার কাজ ফেডারেশনের নজরে পড়ে। এরপর তিনি রদ্রি, উনাই সিমোন এবং মিকেল মেরিনোদের নিয়ে অনূর্ধ্ব-১৯ ইউরো জয় করেন।
২০২২ সালে তিনি স্পেনের জাতীয় দলের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। অনূর্ধ্ব-১৯, অনূর্ধ্ব-২১ এবং অলিম্পিক দলের কোচ হিসেবে তিনি বর্তমান স্কোয়াডের বেশিরভাগ খেলোয়াড়কেই দীর্ঘকাল ধরে চেনেন। দানি ওলমো, পেদ্রি বা মার্ক কুকুরেল্লাদের সঙ্গে তার এক দশকের সম্পর্ক।
তার কোচিং পদ্ধতি হলো—প্রতিপক্ষের প্রতি শ্রদ্ধা, ধৈর্য এবং শান্ত থাকা। ত্যাগ ও বিনয় তার কাজের মূল ভিত্তি। এমনকি ইউরো ২০২৪ ফাইনালের আধা ঘণ্টা আগেও তিনি ফোন করে পরিবারের খোঁজ নিয়েছিলেন। তার ছেলে আলবার্তোও স্পেনের কোচিং স্টাফের সদস্য।
আর্জেন্টিনার ড্রেসিংরুম ও স্কালোনির দর্শন
স্কালোনির কোচিং শিক্ষা স্প্যানিশ ক্লাসরুমে নয়, বরং আর্জেন্টিনার ড্রেসিংরুমের অলিগলিতে হয়েছে। যেখানে অভিজ্ঞ খেলোয়াড়দের প্রাধান্য থাকে।
পুজাতোর ছোট শহরে বেড়ে ওঠা স্কালোনি ১৯৯৭ সালে আর্জেন্টিনার অনূর্ধ্ব-২০ বিশ্বকাপ জয়ী দলের সদস্য ছিলেন। তার সঙ্গে বর্তমানে বেঞ্চে থাকা ওয়াল্টার স্যামুয়েল এবং পাবলো আইমারও সেই দলের সদস্য ছিলেন।
খেলোয়াড়ি জীবন শেষে ২০১৪-১৫ সালে অবসরের সময় তিনি মানসিকভাবে বেশ ভেঙে পড়েছিলেন। তখন তিনি স্থানীয় একটি ক্লাবে ১৪ বছর বয়সীদের কোচিং করিয়ে আনন্দ খুঁজে পান।
২০১৬ সালে সেভিয়াতে হোর্হে সাম্পাওলির সহকারী হিসেবে কাজ শুরু করেন। পরবর্তীতে সাম্পাওলির সঙ্গে তিনিও আর্জেন্টিনার দায়িত্ব পান। ২০১৮ বিশ্বকাপে ব্যর্থতার পর সাম্পাওলি বরখাস্ত হলে স্কালোনিকে প্রধান কোচ করা হয়।
তার কোচিংয়ের মূল বিষয় কৌশল নয়, বরং খেলোয়াড়দের সঙ্গে ব্যক্তিগত সম্পর্ক। বারবিকিউ পার্টি, কারাওকে নাইট—এসবের মাধ্যমে তিনি দলের মধ্যে একতা বজায় রাখেন। বিশ্বকাপ ও কোপা আমেরিকা জয়ের পর মানসিক চাপের মুখে তিনি নিজেই মনোবিদের সাহায্য নিয়েছিলেন।
ধারাবাহিকতায় বিশ্বাস
এই দুই কোচের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো দলের প্রতি তাদের অগাধ আস্থা। দে লা ফুয়েন্তে যেমন তরুণ প্রজন্মের খেলোয়াড়দের ওপর ভরসা রেখেছেন, স্কালোনিও ২০১৯ কোপা আমেরিকায় ব্রাজিলের কাছে হারের পরেও মেসিদের সঙ্গীদের ওপর আস্থা অটুট রেখেছিলেন।
দুজনই মনে করেন, জাতীয় দলের কোচ হওয়া একটি পরম সৌভাগ্য। তাদের কাছে ফুটবলের বড় জয় হলো দেশের মানুষকে আনন্দ দেওয়া।
রবিবার ফাইনালে আবারও মুখোমুখি হচ্ছেন শিক্ষক ও ছাত্র। তারা হয়তো আলাপচারিতায় হার-জিতের হিসাব করবেন। তবে খেলার মাঠের বাইরে থেকেও যে তারা ফুটবলের মূল পাতায় নিজেদের নাম লিখেছেন, সেটিই এখন বড় সত্য।
