ইউরো ২০১৬: যে গ্রীষ্ম চিরতরে বদলে দিয়েছিল ওয়েলস ফুটবলকে
“বর্দোর মাঠে হেঁটে যাওয়ার সময় আমি যা অনুভব করছিলাম, তা আজ মনে পড়লে হাসি পায়। আমাদের প্রত্যাশা তখন কতটা সামান্য ছিল!” কথাগুলো এলিস জেমসের। তার মতো আরও অনেকেরই একই অবস্থা ছিল।
অর্ধশতকেরও বেশি সময় ধরে কোনো বড় টুর্নামেন্টে খেলার সুযোগ না পাওয়ায় ওয়েলসের ফুটবল সমর্থকদের প্রত্যাশা ছিল খুবই কম। অতীতের ব্যর্থতার গ্লানি নিয়ে বড় হওয়া প্রজন্মের কাছে ইউরো ২০১৬-তে অংশগ্রহণই ছিল বড় স্বপ্নপূরণ। ১১ জুন বর্দোর রৌদ্রোজ্জ্বল বিকেলে হাজার হাজার ওয়েলস সমর্থক জড়ো হন স্লোভাকিয়ার বিপক্ষে তাদের উদ্বোধনী ম্যাচ দেখার জন্য।
কৌতুক অভিনেতা ও উপস্থাপক এলিস জেমস বলেন, “আমরা শুধু বলছিলাম, অন্তত জাতীয় সংগীতটা তো ভালো হবে। ১০-০ গোলে হারলেও জাতীয় সংগীতটা তো নিশ্চিত শোনা যাবে।” ৫৮ বছর পর কোনো বড় টুর্নামেন্টে ওয়েলসের জাতীয় সংগীত শোনা ছিল আবেগের চরম বহিঃপ্রকাশ। গ্যারেথ বেল ও অ্যারন রামসির মতো তারকাসমৃদ্ধ ওয়েলস দল তখন কোচ ক্রিস কোলম্যানের অধীনে নতুন উচ্চতায় পৌঁছানোর অপেক্ষায় ছিল।
কোলম্যান স্মরণ করেন, “আমি খেলোয়াড়দের শান্ত থাকতে বলছিলাম। কিন্তু বর্দো যেন কার্ডিফের মতো হয়ে গিয়েছিল। হোটেলের বাইরে ওয়েলসের সমর্থক আর বাসে ওঠার সময় আমিও তাদের সঙ্গে স্লোগান দিচ্ছিলাম। নিজেকে সামলানোই কঠিন হয়ে পড়েছিল।” শেষ পর্যন্ত বেল ও হাল রবসন-কানু গোল করে ওয়েলসকে জয় এনে দেন। এই জয় পুরো জাতিকে আনন্দ জোয়ারে ভাসিয়েছিল।
টটেনহ্যামের ডিফেন্ডার বেন ডেভিস বলেন, “ইউরো ২০১৬ ছিল ওয়েলস ফুটবলের টার্নিং পয়েন্ট। ১৯৫৮ সালের কথা শুনতাম, কিন্তু ইউরোয় জায়গা করে নেওয়াটা একটা অসম্ভব স্বপ্ন মনে হতো। এই অংশগ্রহণ আমাদের শিখিয়েছে যে, সাফল্য পাওয়া সম্ভব।”
ইউরোর আগের সময়টা ছিল ওয়েলসের জন্য বেদনার ইতিহাস। কিন্তু ফ্রান্সে পৌঁছে তারা সেই ইতিহাস থেকে মুক্তি পায়। রামসি বলেন, “অনেক নিচু পর্যায় থেকে উঠে এসে এই অর্জন ছিল বিশাল।” রাশিয়ার বিপক্ষে ৩-০ গোলের দাপুটে জয় এবং বেলজিয়ামের বিপক্ষে কোয়ার্টার ফাইনালে ৩-১ গোলের ঐতিহাসিক জয় ওয়েলসকে সেমিফাইনালে পৌঁছে দেয়। বিশেষ করে রবসন-কানু যে গোলটি করেছিলেন, তা ওয়েলস ফুটবলের অন্যতম স্মরণীয় মুহূর্ত হয়ে আছে।
জো লেডলি বলেন, “আমরা বেলজিয়ামকে পুরোপুরি কোণঠাসা করেছিলাম।” সেমিফাইনালে পর্তুগালের কাছে ২-০ গোলে হারলেও, এই টুর্নামেন্ট ওয়েলস ফুটবলে এক সোনালী অধ্যায়ের সূচনা করে।
ওয়েলস ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনের (FAW) তৎকালীন প্রধান নির্বাহী জোনাথন ফোর্ড জানান, ইউরো ২০১৬ থেকে প্রাপ্ত অর্থ তারা নারী ফুটবল এবং তৃণমূল পর্যায়ে বিনিয়োগ করেন। লরা ম্যাকঅ্যালিস্টার বলেন, “ইউরো ২০১৬ আমাদের মানসিকতায় পরিবর্তন এনেছিল। এটি প্রমাণ করেছে যে স্বপ্ন দেখা সম্ভব এবং তা অর্জন করাও সম্ভব।”
আজকের ওয়েলস ফুটবল দল বড় টুর্নামেন্টে খেলার প্রত্যাশা নিয়ে মাঠে নামে, যা ২০১৬ সালের সেই ঐতিহাসিক গ্রীষ্মের অবদান। বর্তমান প্রজন্ম আগের সাফল্যের ওপর ভিত্তি করে এগিয়ে যাচ্ছে। লেডলি বলেন, “আজও রাস্তায় মানুষ দেখা হলে বলে, ২০১৬ সালের জন্য ধন্যবাদ, ওটাই ছিল আমার জীবনের সেরা গ্রীষ্ম।” জেমসও সেই সুরেই বলেন, “ওটি সত্যিই আমার জীবনের সেরা মাস ছিল।”
