লিভারপুলের নতুন কৌশলে আন্দোনি ইরাওলার ছাপ, প্রাক-মৌসুমে চলছে পরীক্ষা-নিরীক্ষা
জয় পাওয়া সবসময়ই গুরুত্বপূর্ণ, তবে অনেক সমর্থকের কাছে জয় পাওয়ার প্রক্রিয়ার ধরনটাও সমান তাৎপর্যপূর্ণ। যখন কাঙ্ক্ষিত ফলাফল পাওয়া যায় না, তখন দলের খেলা যদি দর্শকদের আনন্দ দেয়, তবে একজন কোচ সমালোচকদের কাছ থেকে কিছুটা বাড়তি সময় পাওয়ার সুযোগ পান। আর্নে স্লটের স্থলাভিষিক্ত হয়ে লিভারপুলের প্রধান কোচের দায়িত্ব নিয়েছেন আন্দোনি ইরাওলা। অনেকেই মনে করেন, এই স্প্যানিশ কোচের খেলার ধরন ইয়ুর্গেন ক্লপের সময়ে অ্যানফিল্ডে পরিচিত সেই ‘হেভি মেটাল’ ফুটবলের সাথেই বেশি সামঞ্জস্যপূর্ণ।
ইরাওলার অধীনে লিভারপুল প্রাক-মৌসুমের প্রস্তুতিতে এখন পর্যন্ত কেমন খেলছে?
লিভারপুল প্রাক-মৌসুমে সান্ডারল্যান্ড এবং রেক্সহ্যামের বিপক্ষে জয় পেলেও লিডস এবং মোনাকোর বিপক্ষে দুই গোলের লিড নিয়েও হার মেনেছে। এই ম্যাচগুলোতে তারা গড়ে ৬০.৬ শতাংশ বল পজেশন নিজেদের দখলে রেখেছিল—যা গত মৌসুমে বোর্নমাউথের গড় পজেশনের চেয়ে ১২.৯ শতাংশ বেশি। প্রতিপক্ষ দলগুলো লিভারপুলের বিপক্ষে সাধারণত রক্ষণাত্মক খেলতে পছন্দ করে, তাই বেশি বল নিয়ন্ত্রণে রাখাটা ইরাওলার জন্য একটি নতুন চ্যালেঞ্জ। আর তিনি তার পূর্বের দলগুলোর মতোই তীব্র ও ছন্দময় ফুটবল খেলার ধারা বজায় রাখার চেষ্টা করছেন।
লিভারপুলে যোগ দেওয়ার পর ইরাওলার কৌশলগুলো অনেকটাই আগের মৌসুমের মতো মনে হচ্ছে। গোলরক্ষক, চার রক্ষণভাগের খেলোয়াড় এবং এক বা দুজন মিডফিল্ডারকে নিয়ে নিচ থেকে বল সাজিয়ে খেলার চেষ্টা করছে দল। ডমিনিক সোবোসলাই এবং ট্রে নাইনি প্রাক-মৌসুমে মিডফিল্ডের দায়িত্ব সামলাচ্ছেন। তারা নিচ থেকে বল নিয়ে ফাঁকা জায়গায় থাকা উইঙ্গারদের দিকে বাড়িয়ে দিচ্ছেন।
ইরাওলার দল দ্রুত এবং সরাসরি পাল্টা আক্রমণের জন্য পরিচিত। তবে লিভারপুল যখন বল নিয়ন্ত্রণে রাখার চেষ্টা করে, তখন এই সংক্ষিপ্ত পাসগুলো প্রতিপক্ষের ওপর চাপ সৃষ্টির কাজ করে। প্রতিপক্ষ যখনই প্রেস করতে আসে, লিভারপুল তখনই দ্রুত ফরোয়ার্ড পাস বাড়ানোর সুযোগ খোঁজে। যদি প্রতিপক্ষ শুরুতেই চাপ তৈরি করে, তখন অ্যালিসন অথবা জর্জি মামারদাশভিলি লম্বা পাসের মাধ্যমে খেলা দ্রুত উপরে পাঠিয়ে দিচ্ছেন। এতে বলের দখল হারালেও, লিভারপুল পুনরায় বল ফিরে পাওয়ার জন্য ভালো অবস্থানে থাকছে এবং রক্ষণভাগের ফাঁকফোকর কাজে লাগাচ্ছে।
ইরাওলার আক্রমণভাগের মূলনীতিগুলো অনেকটা তার অনুপ্রেরণা মার্সেলো বিয়েলসার মতো। ২০১১ থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত অ্যাথলেটিক ক্লাবে বিয়েলসার অধীনে খেলেছেন ইরাওলা। তিনি বলেন, “আমি মার্সেলোর অনেক কৌশল ব্যবহার করি। তার দল আক্রমণাত্মক দিক থেকে খুবই গতিশীল।”
বিয়েলসার মতোই ইরাওলা খেলোয়াড়দের নির্দিষ্ট অবস্থানে আটকে না রেখে খেলার স্বাধীনতা দিচ্ছেন। উইঙ্গাররা ভেতরে চলে এলে ফুল-ব্যাকরা জায়গা পাচ্ছেন, আবার মিডফিল্ডাররা নতুন পাসিং অপশন তৈরি করছেন। এই কৌশলে প্রতিপক্ষ ঠিক বুঝে উঠতে পারছে না কাকে মার্ক করবে। ফুল-ব্যাকরা আক্রমণভাগে যোগ দেওয়ার ফলে লিভারপুলের আক্রমণ অনেক বেশি বৈচিত্র্যময় হচ্ছে।
তবে এই খেলার ধরনে দল কিছুটা ভারসাম্যহীন হয়ে পড়ে। আক্রমণ সাজাতে গিয়ে প্রায়ই ছয় বা সাতজন খেলোয়াড় সামনের দিকে এগিয়ে থাকছেন, যা রক্ষণভাগকে পাল্টা আক্রমণের মুখে ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলছে। ইরাওলা যদিও স্বীকার করেছেন যে তাদের এখনো অনেক কাজ বাকি, বিশেষ করে দ্বিতীয়ার্ধে ফিটনেস ও সমন্বয়ের অভাবে গোল হজমের প্রবণতা কমাতে হবে।
প্রাক-মৌসুম জুড়ে ইরাওলার হাই-প্রেস কৌশলও ফুটে উঠেছে। সোবোসলাইকে তিনি মিডফিল্ডে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা দিয়েছেন। তারা সাধারণত ৪-৪-২ ডায়মন্ড শেপে প্রেস করার চেষ্টা করছেন। সোবোসলাইয়ের শারীরিক সক্ষমতা এবং সঠিক সময়ে এগিয়ে আসার বিচারবুদ্ধি এই রক্ষণে বড় ভূমিকা রাখছে। হাঙ্গেরির এই অধিনায়ক নতুন কোচ সম্পর্কে বলেন, “তিনি সত্যিই খুব ভালো। আমাদের যে তীব্রতার প্রয়োজন ছিল, তা এখন ফিরে এসেছে।”
চারটি প্রাক-মৌসুম ম্যাচ খুব ছোট একটি নমুনা, তবে লিভারপুলে ইরাওলার ছাপ স্পষ্ট। বোর্নমাউতে তার যে কৌশলগুলো সফল হয়েছিল, সেগুলোই তিনি এখানে প্রয়োগ করছেন। তবে দীর্ঘ মৌসুমে দলের গভীরতা বজায় রেখে এই আক্রমণাত্মক ও অগোছালো ফুটবলের সাথে কীভাবে ভারসাম্য রক্ষা করবেন, সেটাই এখন দেখার বিষয়।
