ইউরোপা লিগে রূপকথার জয় বোর্নমাউথের, স্বপ্নপূরণের পথে ঐতিহাসিক যাত্রা
ভাইটালিটি স্টেডিয়ামে এক অবিস্মরণীয় রাত পার করল এএফসি বোর্নমাউথ। ক্লাবের ১২৭ বছরের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো ঘরের মাঠে ইউরোপীয় প্রতিযোগিতার ম্যাচে মাঠে নেমেছিল তারা। এই ঐতিহাসিক মুহূর্তের সাক্ষী হতে আসা সমর্থকদের চোখেমুখে ছিল আবেগ। স্টেডিয়ামের স্ট্যান্ডের পেছনে বিশাল এক টিফো (tifo) তোলা হয়েছিল, যেখানে লেখা ছিল, ‘মাইনাস ১৭ থেকে ইউরোপীয় স্বপ্নের পথে। এএফসি বোর্নমাউথ, ১৮৯৯ সালে প্রতিষ্ঠিত।’
২০০৮ সালের দিকে বোর্নমাউথের এমন একটি রাতের কথা কল্পনা করাও কঠিন ছিল। মাত্র ১৮ বছর আগে ক্লাবটি অস্তিত্ব সংকটে পড়েছিল। তখন আর্থিক প্রশাসনিক জটিলতায় জড়িয়ে ১০ পয়েন্ট কাটা যাওয়ায় ক্লাবটি লিগ ওয়ান থেকে রেলিগেশনে পড়ে গিয়েছিল। তবে দুর্দিন সেখানেই শেষ হয়নি। ২০০৮-০৯ মৌসুমে অংশ নেওয়ার জন্য এডি হাওয়ের অধীনে থাকা দলটিকে লিগ টু-তে আরও ১৭ পয়েন্ট জরিমানা মেনে নিতে হয়েছিল।
সেই পরিস্থিতি ক্লাবটিকে লিগের তলানিতে ঠেলে দিয়েছিল এবং মনে হয়েছিল তারা নন-লিগ দলে পরিণত হতে চলেছে। কিন্তু মৌসুমের শেষে বোর্নমাউথ কেবল ইংলিশ ফুটবলের ইতিহাসে অন্যতম সেরা প্রত্যাবর্তনই করেনি, বরং নিজেদের টিকে থাকা নিশ্চিত করে পরবর্তী এক দশকের সাফল্যের ভিত্তি গড়ে দেয়। যার চূড়ান্ত প্রতিফলন ঘটে ২০১৫ সালে প্রথমবারের মতো প্রিমিয়ার লিগে তাদের পদোন্নতির মাধ্যমে।
বর্তমান সময়ে ইউরোপা লিগে বোর্নমাউথ তাদের সাফল্যের ধারাবাহিকতা বজায় রেখেছে। বৃহস্পতিবার স্টুরম গ্রাজের বিপক্ষে ৩-০ গোলের জয় তাদের বড় ইউরোপীয় প্রতিযোগিতায় প্রথম দুই ম্যাচ জেতা দ্বিতীয় ইংলিশ দলে পরিণত করেছে। এর আগে ২১ বছর আগে উয়েফা কাপে বোল্টন এই কৃতিত্ব অর্জন করেছিল।
সাবেক ডিফেন্ডার জোয়েল ওয়ার্ড বলেন, “এটি তাদের স্মৃতিতে চিরকাল থেকে যাবে। ক্লাবের মালিক বিল ফোলি যখন দায়িত্ব নেন, তখনই তিনি ইউরোপে এই ক্লাবের স্বপ্ন দেখেছিলেন। তিনি ক্লাবের মানদণ্ড তৈরি করেছেন এবং বিনিয়োগ করেছেন। তিনি তার চাওয়া পূরণ করেছেন এবং দলটি অসাধারণ শুরু করেছে।”
স্মিথের রূপকথার গল্পের প্রতিফলন
২০০৮ সাল থেকে বোর্নমাউথের উত্থানের প্রকৃতি এমনই ছিল যে, এমন একটি রূপকথার গল্পের অপেক্ষায়ই ছিল সবাই। বুধবার ম্যাচের আগের সংবাদ সম্মেলনে ক্লাবের দীর্ঘদিনের খেলোয়াড় ডিফেন্ডার অ্যাডাম স্মিথ জানিয়েছিলেন, তিনি কোনোদিন ভাবেননি বোর্নমাউথের হয়ে ইউরোপের মঞ্চে অধিনায়কত্ব করবেন।
তবে স্মিথের জন্য আরও বড় অর্জন অপেক্ষা করছিল। এই রাইট-ব্যাক ইউরোপীয় প্রতিযোগিতায় ঘরের মাঠে বোর্নমাউথের প্রথম গোলের অ্যাসিস্ট করে নিজের নাম ইতিহাসে লিখিয়ে নিয়েছেন। প্রথমার্ধের শেষ দিকে তার বাড়ানো বলে ইভানিলসন হেডের মাধ্যমে গোলটি করেন। ৪৩০টির বেশি ম্যাচ খেলা এই ৩৫ বছর বয়সী তারকা দলের হয়ে তিনটি পদোন্নতি ও দুবার প্রিমিয়ার লিগে ওঠার পথে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন।
দ্বিতীয়ার্ধে যখন তাকে মাঠ থেকে তুলে নেওয়া হয়, তখন সমর্থকরা উঠে দাঁড়িয়ে তার নামে জয়ধ্বনি দেন। ওয়ার্ড যোগ করেন, “স্মিথ পরিশ্রম এবং সফলতার এক উজ্জ্বল উদাহরণ। এমন রাতগুলোর জন্যই মানুষ বেঁচে থাকে।”
একতাই বড় শক্তি
ম্যাচ শেষে ভাইটালিটি স্টেডিয়ামের সমর্থকরা দীর্ঘক্ষণ গ্যালারিতে থেকে এই ঐতিহাসিক রাতকে উদযাপন করেন। তবে কোচ মার্কো রোজ এবং তার শিষ্যদের মনোযোগ এখন দ্রুতই প্রিমিয়ার লিগের পরবর্তী ম্যাচের দিকে সরছে। ইউরোপা লিগে দারুণ পারফরম্যান্স করলেও প্রিমিয়ার লিগে দলটি এখনো ছন্দ খুঁজে পায়নি। তারা টেবিলের ১৮তম স্থানে রয়েছে এবং এই মৌসুমে এখনো কোনো জয় পায়নি।
কোচ মার্কো রোজ বলেন, “আমরা যদি ঐক্যবদ্ধ থাকি এবং এভাবে খেলি, তবে প্রতিপক্ষের জন্য আমাদের হারানো কঠিন। আগামী ম্যাচে আমাদের এই ফর্ম বজায় রাখতে হবে।” আগামী সপ্তাহে এসি মিলান ভাইটালিটি স্টেডিয়ামে এলে বোর্নমাউথের এই অসাধারণ গল্পের নতুন ও আকর্ষণীয় অধ্যায় শুরু হবে।
