বোর্নমাউথের কাছে হার, ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডে কোচ ক্যারিকের ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা
বোর্নমাউথের কাছে ৩-০ গোলে ঘরের মাঠে হারের পর ওল্ড ট্রাফোর্ডের চারপাশে মাইকেল ক্যারিকের হাঁটার মধ্যে এক ধরনের অনিবার্যতার আভাস ছিল।
ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড ভক্তদের উদ্দেশে ক্যারিকের অভিবাদন জানানো নতুন কিছু নয়। কোমোর মাঠে পরাজয়ের পর তিনি যেভাবে ভক্তদের অভিবাদন জানিয়েছিলেন, ওল্ড ট্রাফোর্ডে তার প্রতিফলন কিছুটা কম ছিল। তবে টানা আট ম্যাচ জয়হীন থাকার পর—যা ২০১৫-১৬ মৌসুমের পর দলের সবচেয়ে খারাপ পারফরম্যান্স—এবং এক সপ্তাহের মধ্যে দুটি ভয়াবহ হারের পর ক্যারিকের সময় ফুরিয়ে আসছে। ক্লাব কর্তৃপক্ষ তার ভবিষ্যৎ নিয়ে গুরুতর আলোচনায় বসেছে।
তবে ক্লাবের কোনো উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা যদি মনে করেন যে কেবল প্রধান কোচ পরিবর্তন করলেই ওল্ড ট্রাফোর্ডের সমস্যার সমাধান হবে এবং নতুন কাউকে ডাগআউটে দেখলে ভক্তরা শান্ত হয়ে যাবে, তবে মাঠের পরিস্থিতি তাদের সেই ধারণা ভুল প্রমাণ করেছে।
শুক্রবার কোমোর কাছে ৪-১ ব্যবধানে হারের পর ক্যারিক বলেছিলেন, “রবিবার আমরা ভিন্ন এক দল হব। আমাদের রবিবার ভিন্ন দল হয়েই মাঠে নামতে হবে।” কিন্তু বাস্তবে তা দেখা যায়নি। আগামী শনিবার চেলসির বিপক্ষে ম্যাচে তিনি দায়িত্বে থাকবেন কি না, সেই প্রশ্নের উত্তর নেই তার কাছে। তিনি নিজেও তা জানেন না।
ক্যারিক বলেন, “এর দায়ভার আমার। এই মুহূর্তে আমি আর কী বলতে পারি? আমি পরিস্থিতিটি পুরোপুরি বুঝি। আমি কোনো কিছু আশা করছি না। আমি এই জায়গাটিকে ভালোবাসি এবং ক্লাবের জন্য যা ভালো মনে করি, আমি সবসময় তাই করব।”
তিন মৌসুমে তিনবার কোচ ছাঁটাইয়ের প্রভাব
ম্যাচ শেষে ড্রেসিংরুমের টানেলে চলে যাওয়ার সময় ইউনাইটেড ভক্তরা দলের পারফরম্যান্স নিয়ে তাদের রায় দিয়েছেন। শুরুর দিকে তারা সাবেক এই মিডফিল্ডারের নামে স্লোগান দিলেও, তিনি দৃষ্টির আড়াল হতেই ভক্তরা খেলোয়াড়দের ওপর ক্ষোভ ঝাড়েন। দিওগো দালোত মাঠ ছাড়ার আগ পর্যন্ত এই দুয়োধ্বনি চলতে থাকে। ভক্তরা মনে করেন, খেলোয়াড়রা হয় যথেষ্ট যোগ্য নন, অথবা তাদের মধ্যে কোনো দায়বদ্ধতা নেই।
ম্যাচ শুরুর এক মিনিটের মধ্যেই গ্লেজার পরিবার এবং স্যার জিম র্যাটক্লিফের বিরুদ্ধে স্লোগান শোনা যায়। ২০০৫ সালে গ্লেজার পরিবার ক্লাবটি কেনার পর থেকেই তারা ইউনাইটেড সমর্থকদের কাছে প্রধান শত্রুতে পরিণত হয়েছে। তাদের নতুন হিসাব অনুযায়ী, ক্লাবের ওপর ঋণের বোঝা এখন ১.১৫ বিলিয়ন পাউন্ড ছাড়িয়ে গেছে। ফুটবল ফিন্যান্স ব্লগার সুইস র্যাম্বলের মতে, এই ঋণের সুদের পেছনে খরচ হয়েছে ৮৫২ মিলিয়ন পাউন্ড। গত আর্থিক বছরে সুদের পরিমাণ ছিল ৩৭ মিলিয়ন পাউন্ড, যা আগের বছরের চেয়ে ৩ মিলিয়ন পাউন্ড বেশি। ভক্তদের দাবি, এই অর্থ দিয়ে ভালো খেলোয়াড় কেনা যেত।
২০২৩ সালের বড়দিনের প্রাক্কালে স্যার জিম র্যাটক্লিফ যখন গ্লেজারদের সাথে সংখ্যালঘু শেয়ারহোল্ডার হওয়ার চুক্তি করেন, তখন ভক্তরা পরিবর্তনের আশা করেছিলেন। কিন্তু এরপর একের পর এক সিদ্ধান্তে ক্লাবের ভবিষ্যৎ নিয়ে বড় প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে, ২০২৪ সালের এফএ কাপ ফাইনালে ম্যানচেস্টার সিটিকে হারানোর পর এরিক টেন হ্যাগকে ক্লাব কর্তৃপক্ষ সমর্থন দেয় এবং লেনি ইয়োরো, ম্যাথিয়াস ডি লিট ও ম্যানুয়েল উগার্তের মতো খেলোয়াড়দের পেছনে ২০০ মিলিয়ন পাউন্ডের বেশি খরচ করে। গত সপ্তাহে টেন হ্যাগ ‘দ্য অ্যাথলেটিক’-কে জানান যে, উগার্তের ৫০ মিলিয়ন পাউন্ডের দলবদলের টাকা জোগাড় করতে স্কট ম্যাকটমিনে কে বিক্রি না করার প্রতিশ্রুতি থেকে সরে এসেছিল ক্লাব। অক্টোবরে ডাচ এই কোচকে বরখাস্ত করা হয়।
এরপর ক্লাব রুবেন আমোরিমকে মৌসুমের মাঝপথে স্পোর্টিং থেকে নিয়ে আসে, যদিও তিনি গ্রীষ্ম পর্যন্ত অপেক্ষা করতে চেয়েছিলেন। লিগ টেবিলে ১৫তম স্থানে থাকা সত্ত্বেও ক্লাব তার ওপর আস্থা রেখেছিল, কিন্তু ইএফএল কাপে গ্রিমসবির কাছে হারের পর জানুয়ারিতে ডিরেক্টর অফ ফুটবল জেসন উইলকক্সের সাথে মতবিরোধের জেরে তাকে বরখাস্ত করা হয়। এর ফলে ক্যারিক দায়িত্ব গ্রহণ করেন এবং দুই বছর পর ক্লাবকে চ্যাম্পিয়নস লিগে ফিরিয়ে আনেন। তিন মৌসুমে তিনবার কোচ ছাঁটাই কোনো পক্ষকেই ভালো অবস্থানে রাখবে না।
স্ট্রফোর্ড এন্ডে কিংবদন্তি অধিনায়ক ব্রায়ান রবসন, এরিক ক্যান্টোনা এবং রয় কিনের ছবি সম্বলিত ‘স্ট্যান্ডার্ডস’ ব্যানারটি ক্লাবের নির্বাহীদের সেই ঐতিহ্যের কথা মনে করিয়ে দেওয়ার জন্যই তোলা হয়েছিল, যা অর্জন করার চেষ্টা করা উচিত।
খেলোয়াড় নিয়োগ, টিকিট ও নতুন স্টেডিয়াম নিয়ে ভক্তদের অসন্তোষ
জেসন উইলকক্স পর্দার আড়ালে থেকে কাজ করলেও আজকের ম্যাচে তার বিরুদ্ধে ভক্তদের অশ্লীল স্লোগান শোনা গেছে। শেষ বাঁশির প্রায় দুই ঘণ্টা পর স্টেডিয়াম থেকে বেরিয়ে আসার সময় তাকে দুয়োধ্বনি শুনতে হয়েছে। র্যাটক্লিফের দায়িত্ব নেওয়ার পর সাউদাম্পটন থেকে আসা ৫৫ বছর বয়সী এই কর্মকর্তাকে বর্তমান দল গঠনের জন্য দায়ী করেন অনেক সমর্থক।
তার পাশে বসে বোর্নমাউথের কাছে পরাজয় দেখেছেন প্রধান নির্বাহী ওমর বেরাদা, যিনি ম্যানচেস্টার সিটিতে উইলকক্সের সাথে কাজ করেছেন। সিটির আর্থিক অনিয়মের অভিযোগের সাথে বেরাদার সম্পৃক্ততা না থাকলেও, ভক্তরা এই যোগসূত্র নিয়ে ওল্ড ট্রাফোর্ডে স্লোগান দিয়েছেন।
এর বাইরে গ্রীষ্মে চালু হওয়া টিকিটের কালোবাজারি বিরোধী তদন্ত নিয়ে বড় ফ্যান গ্রুপগুলোর সঙ্গে ক্লাবের দূরত্ব তৈরি হয়েছে। ক্লাব কর্তৃপক্ষ দাবি করে তারা অসাধু চক্রকে ধরতে চাইছে, কিন্তু ভক্তদের মনে হয় তারা প্রকৃত দর্শকদের সরিয়ে কর্পোরেটদের প্রাধান্য দিচ্ছে। এছাড়া ১০০,০০০ দর্শক ধারণক্ষমতার নতুন স্টেডিয়াম তৈরির পরিকল্পনা নিয়েও সমর্থকদের মধ্যে অনাস্থা রয়েছে। স্টেডিয়ামটির খরচ ২ বিলিয়ন পাউন্ড ছাড়াতে পারে এবং ক্লাব এ বছরই জমি কেনার জন্য ৬৩.৫ মিলিয়ন পাউন্ড খরচ করেছে। স্ট্রফোর্ড এন্ডে উপস্থিত ভক্তরা স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছেন যে, নতুন স্টেডিয়ামের বিষয়ে তাদের কোনো আগ্রহ নেই।
ক্যারিক হারের দায় নিলেও ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডে অস্থিরতার কারণ কেবল মাঠের ফলাফল নয়, বরং তার চেয়েও বেশি কিছু।
