সেমিফাইনালে আর্জেন্টিনার কাছে হার, রক্ষণাত্মক কৌশলে সমালোচনার মুখে তুখেল
১৯৬৬ সালের পর প্রথমবারের মতো পুরুষদের বিশ্বকাপ ফুটবলের ফাইনালে ওঠার দ্বারপ্রান্তে ছিল ইংল্যান্ড। আটলান্টা স্টেডিয়ামে বর্তমান বিশ্বচ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনার বিপক্ষে ৮৪ মিনিট পর্যন্ত ১-০ গোলে এগিয়ে ছিল ইংলিশরা। কিন্তু এরপরই ম্যাচের চিত্র পুরোপুরি বদলে যায়।
৮৫তম মিনিটে এনজো ফার্নান্দেজ গোল করে আর্জেন্টিনাকে সমতায় ফেরান। এরপর ৯২তম মিনিটে লাউতারো মার্টিনেজ গোল করে দলকে এগিয়ে নেন। মজার ব্যাপার হলো, দুটি গোলেরই জোগানদাতা ছিলেন লিওনেল মেসি। মুহূর্তের মধ্যেই ইংল্যান্ডের বিশ্বকাপ জয়ের স্বপ্ন ধূলিসাৎ হয়ে যায়।
৫৫তম মিনিটে অ্যান্থনি গর্ডনের গোলে লিড নিলেও শেষ পর্যন্ত রক্ষণাত্মক কৌশলের চড়া মূল্য দিতে হয়েছে ইংল্যান্ডকে। দলের কোচ টমাস তুখেলের রক্ষণাত্মক সিদ্ধান্তটি বুমেরাং হয়ে দাঁড়ায়। ফলে রবিবার নিউ ইয়র্ক নিউ জার্সি স্টেডিয়ামে স্পেনের বিপক্ষে ফাইনালে লড়বে আর্জেন্টিনা।
ম্যাচে লিড নেওয়ার পর ইংল্যান্ড কেন আক্রমণে না গিয়ে রক্ষণভাগে মনোযোগ দিল, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। গোল করার পর থেকে দ্বিতীয় গোল হজম করার আগ পর্যন্ত ইংল্যান্ড বলের দখল রেখেছিল মাত্র ১২ শতাংশ। কোচ তুখেল ম্যাচের শেষ দিকে মার্কাস রাশফোর্ড ও ইভান টনিকে নামালেও তার আগে এজরি কনসা, ড্যান বার্ন এবং নিকো ও’রাইলির মতো রক্ষণাত্মক খেলোয়াড়দের মাঠে নামিয়েছিলেন তিনি।
ইংল্যান্ডের সাবেক অধিনায়ক ওয়েন রুনি বিবিসি স্পোর্টকে বলেন, “আমরা ভেঙে পড়েছি। এটি কোচ এবং তার নেওয়া সিদ্ধান্তের কারণে হয়েছে। কৌশলটি অত্যন্ত নিষ্ক্রিয় ছিল। বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের বিপক্ষে এমন রক্ষণাত্মক মানসিকতা নিয়ে টিকে থাকা অসম্ভব। এটি আমাদের জন্য সবচেয়ে বড় পরীক্ষা ছিল, যেখানে আমরা ব্যর্থ হয়েছি।”
‘কোচিং বিপর্যয়’ – সাটন
এই বিশ্বকাপে ইংল্যান্ড বিভিন্ন সময়ে নিজেদের চরিত্র ফুটিয়ে তুলেছিল। শেষ বত্রিশে ডিআর কঙ্গো এবং কোয়ার্টার ফাইনালে নরওয়েকে হারিয়েছে তারা। তবে সাবেক অধিনায়ক অ্যালান শিয়ারার মনে করেন, আর্জেন্টিনার মান অন্য সব দলের চেয়ে ভিন্ন। তিনি বলেন, “নরওয়ে বা মেক্সিকোর বিপক্ষে রক্ষণ সামলে জয় পাওয়া সম্ভব ছিল, কিন্তু আর্জেন্টিনার খেলোয়াড়দের দক্ষতা ও গোল করার ক্ষমতা অনেক বেশি। তুখেল খুব দ্রুত রক্ষণাত্মক খেলোয়াড় নামিয়ে ভুল করেছেন।”
ম্যাচের ৫২ মিনিটে গর্ডন গোল করার পর ইংল্যান্ডের ভক্তরা আনন্দে মেতেছিলেন, কিন্তু এরপরই ইংলিশরা রক্ষণাত্মক হয়ে পড়ে। ১৯৯৪-৯৫ মৌসুমে ব্ল্যাকবার্নের হয়ে প্রিমিয়ার লিগ জয়ী ক্রিস সাটন বিবিসি রেডিও ৫ লাইভকে বলেন, “ইংল্যান্ড এগিয়ে যাওয়ার পর আর্জেন্টিনার হাতে খেলার নিয়ন্ত্রণ তুলে দেওয়া ছিল টমাস তুখেলের কোচিং বিপর্যয়। আর্জেন্টিনার মতো দলের বিপক্ষে ৩০ মিনিট ধরে শুধু রক্ষণ সামলানো যায় না। এ ব্যর্থতার দায় কোচেরই।”
সাবেক গোলরক্ষক জো হার্ট বলেন, “নরওয়ে বা মেক্সিকো ইংল্যান্ডের চাপে আতঙ্কিত হয়ে পড়েছিল। কিন্তু আর্জেন্টিনাকে আমি মোটেই আতঙ্কিত দেখিনি। তাদের মধ্যে আত্মবিশ্বাস ছিল এবং তারা জানত কীভাবে লিওনেল মেসিকে কাজে লাগাতে হবে।”
ম্যাচের ৭২ মিনিটে গর্ডনকে তুলে নিয়ে কনসাকে নামিয়ে পাঁচজনের রক্ষণভাগ তৈরি করেন তুখেল। পরে ড্যান বার্ন ও ও’রাইলিকে নামানো হয়। সাবেক ইংলিশ ডিফেন্ডার মিকা রিচার্ডস বলেন, “১-০ গোলে এগিয়ে যাওয়ার পর ইংল্যান্ডের উচিত ছিল দ্বিতীয় গোলটির জন্য ঝাঁপানো। তারা রক্ষণাত্মক হয়ে যাওয়ায় আর্জেন্টিনা খেলার সুযোগ পেয়েছে।”
‘১-০ গোলে এগিয়ে যাওয়ার পর আমরা শুধু টিকে থাকার চেষ্টা করেছি’
আর্জেন্টিনার গোলরক্ষক এমিলিয়ানো মার্টিনেজ নিজেও স্বীকার করেন, ইংল্যান্ড রক্ষণাত্মক হওয়ায় খেলার গতি বদলে যায়। তিনি বলেন, “আপনি যখন জিতছেন, তখন আপনাকে আক্রমণ চালিয়ে যেতে হবে। কিন্তু তারা রক্ষণাত্মক খেলোয়াড় নামিয়ে নিজেদের পরিকল্পনাই বদলে ফেলেছিল।”
ইংল্যান্ডের অধিনায়ক হ্যারি কেন বলেন, “আমরা ১-০ গোলে এগিয়ে যাওয়ার পর রক্ষণ আগলে রাখার চেষ্টা করেছি, যা এই পর্যায়ের ফুটবলে যথেষ্ট নয়। আমরা হতাশ, কারণ এই জায়গা পর্যন্ত পৌঁছাতে আমরা অনেক পরিশ্রম করেছি।”
ম্যাচ শেষে সংবাদ সম্মেলনে নিজের সিদ্ধান্তের পক্ষে সাফাই গেয়েছেন টমাস তুখেল। তিনি বলেন, “না, আমি মনে করি না কোনো ভুল ছিল। এটি খেলারই অংশ। হারলেই সমালোচনা হয়, এটাই নিয়ম। মুহূর্তে আমার কোনো আফসোস নেই। দলের খেলোয়াড়রা তাদের সেরাটা দিয়েছে এবং আমরা জয়ের খুব কাছাকাছি ছিলাম।”
বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে উঠলেও ফাইনালে উঠতে ব্যর্থ হওয়ায় তুখেলের কৌশল নিয়ে আগামী কয়েকদিন তীব্র আলোচনা হবেই। মিকা রিচার্ডস যোগ করেন, “আমি টমাস তুখেলকে পছন্দ করি এবং তার সাহসিকতার ভক্ত। কিন্তু আজকের মতো বড় মঞ্চে তিনি ভুল করেছেন এবং সেটি তাকে স্বীকার করতেই হবে।”
