নির্ধারিত হয়েছে ২০২৬ বিশ্বকাপ ফুটবলের সেমিফাইনালিস্ট
বিশ্বকাপ ফুটবলের সেমিফাইনালের লাইনআপ চূড়ান্ত হয়েছে। ফিফা র্যাঙ্কিংয়ের শীর্ষ চারটি দল এখন টুর্নামেন্টের শেষ চারে জায়গা করে নিয়েছে। আগামী মঙ্গলবার ফ্রান্স বনাম স্পেন এবং বুধবার ইংল্যান্ড বনাম আর্জেন্টিনার মধ্যকার ম্যাচ দিয়ে শুরু হচ্ছে সেমিফাইনাল। টুর্নামেন্টের প্রথম ছয়টি ম্যাচে এই চারটি সেরা দলের পারফরম্যান্স ও তাদের শক্তির জায়গাগুলো নিচে আলোচনা করা হলো।
আর্জেন্টিনা
আর্জেন্টিনা দলের বিশাল অভিজ্ঞতা তাদের জন্য একটি বড় সম্পদ হিসেবে প্রমাণিত হয়েছে। অবশ্য দলটির কিছু দুর্বলতা রয়েছে, যেমন উইংয়ে গতির অভাব এবং অনেক সময় এগিয়ে থেকেও লিড ধরে রাখতে না পারা। তবে উত্তেজনাকর ম্যাচের শেষ মুহূর্তে আর্জেন্টিনার চেয়ে শান্ত দল খুব কমই আছে।
লিওনেল মেসির সম্ভবত শেষ বিশ্বকাপ হওয়ায় পুরো দলের ওপর প্রচণ্ড চাপ রয়েছে। এই চাপ সামলে কেপ ভার্দের বিপক্ষে অতিরিক্ত সময়ে জয়, মিশরের বিপক্ষে নাটকীয় প্রত্যাবর্তন এবং সবশেষ শনিবার সুইজারল্যান্ডের বিপক্ষে জয় পেয়েছে আর্জেন্টিনা। প্রতিটি ম্যাচেই দলের কোনো না কোনো খেলোয়াড় জ্বলে উঠে জয়ের পথ তৈরি করেছেন।
প্রথম দুটি ম্যাচে মেসি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন এবং সুইসদের বিপক্ষেও তিনি ছিলেন দলের কেন্দ্রবিন্দুতে। কিন্তু যখন মেসি ও তার সতীর্থরা সুইজারল্যান্ডের রক্ষণভাগ ভাঙতে পারছিলেন না, তখন জুলিয়ান আলভারেজের একটি জোরালো শট দলকে জয় এনে দেয়।
আর্জেন্টিনা এখন পর্যন্ত যে দলগুলোর মুখোমুখি হয়েছে, ইংল্যান্ড এবং ফ্রান্স কিংবা স্পেন তাদের চেয়ে অনেক বেশি শক্তিশালী। শেষ মুহূর্তের ব্যক্তিগত নৈপুণ্যের ওপর ভর করে সবসময় জয় পাওয়া কঠিন হতে পারে। তবে টুর্নামেন্টে এখন পর্যন্ত তাদের খেলার ধরন ও খেলোয়াড়দের সক্ষমতা বিবেচনা করলে, আর্জেন্টিনার এই জয়ের ধারাকে অস্বীকার করার সুযোগ কম।
ইংল্যান্ড
ম্যানেজার থমাস টুখেলের আক্রমণভাগ যে হ্যারি কেইনের খেলার স্টাইলের ওপর ভিত্তি করে গড়া, তা স্পষ্ট। কেইন সাধারণত ‘নম্বর ৯’ পজিশন থেকে নিচে নেমে বল রিসিভ করতে এবং খেলা তৈরি করতে পছন্দ করেন। কেইন যখন নিচে নেমে আসেন, তখন ইংল্যান্ডের উইঙ্গারদের সামনের দিকে এগিয়ে যাওয়ার দায়িত্ব দেওয়া হয়। এজন্যই টুখেল অ্যান্টনি গর্ডন, বুকায়ো সাকা, ননি মাদুয়েকে, মার্কাস র্যাশফোর্ড এবং এবেরচি ইজকে ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে খেলিয়েছেন। তিনি উইংগুলোতে সবসময় সতেজ খেলোয়াড়দের রাখতে চান।
কেইন এবং দ্রুতগতির উইঙ্গারদের এই সমন্বয় জুড বেলিংহামের জন্য মাঠের মাঝখানে গোল করার পথ তৈরি করে দেয়। গত দুটি ম্যাচে বেলিংহাম তার বিপজ্জনক রূপ প্রদর্শন করেছেন।
মেক্সিকোর বিপক্ষে দুই গোল এবং নরওয়ের বিপক্ষে আরও দুটি গোল করে বেলিংহাম ইংল্যান্ডকে সেমিফাইনালে পৌঁছে দিয়েছেন। ৩২ দলের পর্বের ম্যাচে কেইনের গোলটির পর অন্য কোনো খেলোয়াড় ওপেন প্লে থেকে গোল করতে পারেননি।
বেলিংহাম এবং কেইন উভয়েই এখন পর্যন্ত ছয় ম্যাচে ছয়টি করে গোল করেছেন। টুর্নামেন্টে টিকে থাকা দলগুলোর মধ্যে কেবল মেসি এবং কিলিয়ান এমবাপ্পেই তাদের চেয়ে বেশি গোল করেছেন।
ইংল্যান্ডের সাফল্যের পথে একমাত্র বাধা হলো, অন্য কেউ গোল পাচ্ছেন না। গ্রুপ পর্বে ক্রোয়েশিয়ার বিপক্ষে মার্কাস র্যাশফোর্ডের গোলটি ছাড়া বাকি সব গোলই কেইন কিংবা বেলিংহাম করেছেন। আর্জেন্টিনা বা ফাইনালের মতো ম্যাচে যদি এই দুজনকে আটকে দেওয়া হয়, তবে ইংল্যান্ড বড় সমস্যায় পড়বে। তবে এখন পর্যন্ত তাদের থামানো যায়নি।
ফ্রান্স
ফ্রান্সের কোচ দিদিয়ের দেশম তার নিজ দেশের জাতীয় দলের দায়িত্ব নিয়ে চতুর্থ ও শেষ বিশ্বকাপে এসে অভাবনীয় পরিবর্তন এনেছেন। গত দুটি বিশ্বকাপে শক্তিশালী মিডফিল্ডের ওপর ভর করে ফাইনালে উঠলেও, ২০২৬ সালের টুর্নামেন্টে এসে মাঝমাঠ ছিল ফ্রান্সের জন্য সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।
তবে এখন পর্যন্ত মিডফিল্ডের অভাব খুব একটা বোঝা যায়নি। এমবাপ্পে, উসমান ডেম্বেলে এবং মাইকেল ওলিসের আক্রমণভাগের সুবাদে ফ্রান্স ২০২৬ বিশ্বকাপে এখন পর্যন্ত ছয় ম্যাচে ১৬টি গোল করেছে। বর্তমানে বিশ্বকাপে থাকা দলগুলোর মধ্যে এই তিনজনকে সবচেয়ে ভয়ংকর ত্রয়ী হিসেবে দেখা হচ্ছে। এমবাপ্পে ও ডেম্বেলে এই গোলগুলোর মধ্যে ১৩টি করেছেন এবং ওলিসে দলের হয়ে সর্বোচ্চ পাঁচটি অ্যাসিস্ট করেছেন।
২০১৪ সালে ফ্রান্স কোয়ার্টার ফাইনাল পর্যন্ত ৯টি গোল করেছিল। ২০১৮ সালে দ্বিতীয়বার বিশ্বকাপ জয়ের সময় তারা সাত ম্যাচে ১২টি গোল করে। চার বছর আগে ফাইনালে ওঠার পথে ছয় ম্যাচে ১৩টি গোল করেছিল ফ্রান্স।
অলিভিয়ের জিরুদ একজন আন্ডাররেটেড স্ট্রাইকার ছিলেন। তবে এটি স্বীকার করতেই হবে যে, এমবাপ্পে এর আগে বিশ্বকাপে এত ভালো আক্রমণভাগের সতীর্থ পাননি। দেশম তা বুঝতে পেরেছেন এবং দলকে এখন অনেক বেশি আক্রমণাত্মক ফুটবল খেলার স্বাধীনতা দিয়েছেন।
স্পেন
স্পেনের যদি গোলের প্রয়োজন হয়, তবে ম্যানেজার লুইস দে লা ফুয়েন্তে নিশ্চিন্তে মিকেল মেরিনোকে মাঠে নামাতে পারেন। এটি শুনতে অদ্ভুত মনে হলেও নকআউট পর্বে তা বারবার সত্য প্রমাণিত হয়েছে। গত দুটি ম্যাচে ৮৫ মিনিটের আগে মেরিনোকে মাঠে নামাননি কোচ। তা সত্ত্বেও তিনি দুটি ম্যাচেই জয়সূচক গোল করেছেন।
পর্তুগালের বিপক্ষে গোলশূন্য ম্যাচে ৮৫ মিনিটে নামেন মেরিনো। ছয় মিনিট পরই ফেরান তোরেসের অ্যাসিস্ট থেকে তিনি গোল করেন। বেলজিয়ামের বিপক্ষে কোয়ার্টার ফাইনাল ১-১ সমতায় থাকা অবস্থায় ৮৬ মিনিটে মাঠে নামেন তিনি। মাঠে নামার দুই মিনিটের কম সময়ের মধ্যেই তিনি স্পেনকে ২-১ ব্যবধানে এগিয়ে দেন।
৩০ বছর বয়সী মেরিনো বিশ্বকাপের বাছাইপর্বে ছয়টি গোল করেছিলেন, তবে এবারের টুর্নামেন্টে বদলি খেলোয়াড় হিসেবেই তিনি বেশি কার্যকরী। বিশেষ করে যখন স্পেনের আক্রমণভাগ মাঝে মাঝে স্থবির হয়ে পড়ে।
ইউরো ২০২৪ জয়ী দল হিসেবে তাদের সক্ষমতা নিয়ে সন্দেহ নেই। তবে বিশ্বকাপে স্পেনের করা ১১টি গোলের মধ্যে সাতটিই এসেছে সৌদি আরব ও অস্ট্রিয়ার বিপক্ষে। যদি স্পেন প্রতিপক্ষের রক্ষণভাগ দ্রুত ভেঙে ফেলতে পারে, তবে গোলবন্যা বয়ে যায়। আর যদি তা না পারে, তবে ম্যাচটি অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়ে এবং তখন মেরিনোর মতো খেলোয়াড়ের উপস্থিতি জরুরি হয়ে ওঠে।
