প্রিমিয়ার লিগে শুরু হতে যাচ্ছে কোচ ছাঁটাইয়ের মৌসুম, দুশ্চিন্তায় কারা?
প্রিমিয়ার লিগের ম্যানেজারদের জন্য এখন সতর্ক হওয়ার সময়। ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের কোচ মাইকেল ক্যারিকের ভবিষ্যৎ নিয়ে বেশ চাপ তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে বুধবার চ্যাম্পিয়ন্স লিগে কোমোর বিপক্ষে দলের বিব্রতকর পারফরম্যান্সের পর থেকেই এই শঙ্কা আরও ঘনীভূত হয়েছে। প্রিমিয়ার লিগে সাধারণত এই সময়টি ‘কোচ ছাঁটাইয়ের মৌসুম’ হিসেবে পরিচিত।
গত মৌসুমে প্রিমিয়ার লিগ থেকে যেসব কোচ বা হেড কোচ বিদায় নিয়েছিলেন, তারা গড়ে ৩১০ দিন দায়িত্বে ছিলেন। ১০ মাস সময় কি একজন কোচের জন্য তার পরিকল্পনা বাস্তবায়ন, পছন্দের খেলোয়াড় সই করানো এবং ভক্তদের সাথে সম্পর্ক তৈরির জন্য যথেষ্ট? ২০২৫-২৬ মৌসুমে ১১ জন কোচ তাদের ক্লাব ছেড়েছেন, যার মধ্যে চেলসিতে এনজো মারেসকার পদত্যাগ ছিল স্বেচ্ছায়। এবারের মৌসুমে এখনো পর্যন্ত ২০ জন কোচই নিজ নিজ পদে বহাল আছেন। তবে প্রিমিয়ার লিগের ‘ছাঁটাইয়ের মৌসুম’ ঠিক কখন শুরু হয় এবং এই প্রাথমিক পর্যায়ে কারা ঝুঁকির মুখে আছেন, তা এখন বড় প্রশ্ন।
ম্যানেজারদের ছাঁটাই কখন হয়?
সংকটময় পরিস্থিতিতে থাকা ম্যানেজারদের জন্য পরিসংখ্যান মোটেও সুখকর নয়। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, নভেম্বর এবং ডিসেম্বর মাসেই প্রিমিয়ার লিগে সবচেয়ে বেশি কোচ ছাঁটাইয়ের ঘটনা ঘটে। লিগের সব কোচ পরিবর্তনের প্রায় এক-তৃতীয়াংশই এই দুই মাসে হয়ে থাকে। ৩৪টি পূর্ণাঙ্গ মৌসুমের ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যায়, সাধারণত শরৎকালীন আন্তর্জাতিক বিরতির পর এবং বড়দিনের আগে ক্লাবগুলো কোচ পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত নেয়। বিশেষ করে ২০০৩ সালে উইন্টার ট্রান্সফার উইন্ডো চালুর পর এই প্রবণতা আরও স্পষ্ট হয়েছে।
অতীতের ঘটনাপ্রবাহে দেখা যায়, ২০০৬ সালের বড়দিনের প্রাক্কালে চার্লটন অ্যাথলেটিক লেস রিডকে বরখাস্ত করেছিল। লিগে মাত্র সাতটি ম্যাচ পরিচালনা করে মাত্র চার পয়েন্ট পাওয়ার মাশুল দিতে হয় তাকে। সেই সময় রিডের ৪০ দিনের মেয়াদ ছিল দীর্ঘ দুই দশকের মধ্যে সর্বনিম্ন। ২০২২-২৩ মৌসুমে লিডস ইউনাইটেডে স্যাম অ্যালারডাইসের ৩০ দিনের মেয়াদ সেই রেকর্ড ভেঙে দেয়। এছাড়া গত বছর নটিংহ্যাম ফরেস্টে অ্যাঞ্জ পোস্টেকোগলু টিকেছিলেন ৩৯ দিন। নভেম্বরের তালিকায় রয়েছেন চেলসির রবার্তো দি মাতেও (২০১২), টটেনহ্যামের মাউরিসিও পচেত্তিনো (২০১৯) এবং ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের ওলে গানার সোলশায়ার (২০২১)। ডিসেম্বরে হোসে মরিনহোকেও দুইবার বিদায় নিতে হয়েছে—২০১৫ সালে চেলসি থেকে এবং ২০১৮ সালে ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড থেকে।
কোচদের সময় কি কমে আসছে?
গত মৌসুমে বিদায়ী কোচদের গড় মেয়াদ ছিল ৩১০ দিন, যা প্রিমিয়ার লিগের ইতিহাসে দ্বিতীয় সর্বনিম্ন। ১৯৯৪-৯৫ মৌসুমে এই গড় ছিল মাত্র ১৫৪ দিন। সময়ের সাথে সাথে ক্লাব মালিকদের ধৈর্য কমে আসছে। মহামারীর সময় ২০২১-২২ মৌসুমে কোচদের দীর্ঘকাল টিকে থাকার প্রবণতা দেখা গেলেও, এরপর থেকে সেই ধৈর্য কমতে শুরু করেছে। গত শরৎকালে ফরেস্টে পোস্টেকোগলুর স্বল্প মেয়াদী দায়িত্বের পর টটেনহ্যামে ইগর টিউডর মাত্র ৪৪ দিন টিকে ছিলেন।
এবারের মৌসুমে ৯টি ক্লাব নতুন স্থায়ী ম্যানেজার নিয়ে যাত্রা শুরু করেছে। তাদের মধ্যে পাঁচজনই এখন প্রিমিয়ার লিগের পয়েন্ট তালিকার নিচের অর্ধে অবস্থান করছেন। রেলিগেশনের আর্থিক ঝুঁকি এবং সোশ্যাল মিডিয়ার ক্রমবর্ধমান চাপের কারণে ক্লাবগুলো বড় সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে কোনো ছাড় দিতে রাজি নয়।
কাদের নিয়ে দুশ্চিন্তা?
যদিও চলতি মৌসুমে এখনো কোনো কোচ ছাঁটাই হননি, তবে নভেম্বরের আন্তর্জাতিক বিরতির আগেই কয়েকজনের ওপর চাপ বাড়তে শুরু করেছে। কোমোর বিপক্ষে ৪-১ গোলে হারের পর ক্যারিকের ওপর চাপ এখন চরমে। গত সপ্তাহে লিসান্দ্রো মার্টিনেজের ক্লাবের কাঠামোর সমালোচনা এবং অধিনায়ক ব্রুনো ফার্নান্দেজের কৌশলী মন্তব্যের পর ওল্ড ট্র্যাফোর্ডের ড্রেসিংরুমের পরিবেশ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
ম্যাচ অব দ্য ডে’র বিশেষজ্ঞ নেডাম ওনুওহা বলেন, “ব্রুনো মনে করছেন কৌশল ভুল ছিল, অন্যদিকে ক্যারিকের মতে খেলোয়াড়রা পর্যাপ্ত দৌড়াননি। ড্রেসিংরুমে এমন বিভাজন থাকলে কোচের পক্ষে নিয়ন্ত্রণ রাখা কঠিন।”
টটেনহ্যামে টিউডরের উত্তরসূরি রবার্তো ডি জেরবি টানা জয়ে কিছুটা স্বস্তিতে আছেন। ফুলহ্যামের আলভারো আরবেলোয়াও টানা দুই জয়ে চাপমুক্ত। তবে নতুন ফরেস্ট কোচ অলিভার গ্লাজনার এবং সান্ডারল্যান্ডের রেজিস লে ব্রিস, যারা ইউরোপা লিগ সামলাচ্ছেন, তারা বর্তমানে কিছুটা উদ্বেগের মধ্যে আছেন। বোর্নমাউথের মার্কো রোজের শুরুর পারফরম্যান্স আশানুরূপ না হলেও, এসি মিলানের বিপক্ষে ইউরোপা লিগের জয় তাকে কিছুটা স্বস্তি দিয়েছে। ক্রিস্টাল প্যালেসের ম্যানেজার পিয়েরে সেজ ব্রাইটনের কাছে ৫-০ ব্যবধানে হারের পর ভক্তদের কাছে ক্ষমা চেয়েছেন। লেন্স থেকে আসার মাত্র চার মাসের মাথায় তাকে চাকরি বাঁচাতে বড় পরীক্ষার মুখে পড়তে হচ্ছে। অন্যদিকে নিউক্যাসলের নতুন বস ম্যাথিয়াস জেইসলেরও দ্রুত ভালো ফল প্রয়োজন।
এখনো খুব বেশি দেরি না হলেও, ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি বলছে যে খুব শীঘ্রই কেউ না কেউ প্রিমিয়ার লিগের দায়িত্ব ছাড়তে চলেছেন।
