ফিফা বিশ্বকাপে ভিএআর নিয়ে বিতর্ক: মাঠের খেলার চেয়ে প্রযুক্তির প্রভাব কি বেশি?
নরওয়ের ডিফেন্ডার টরবজর্ন হেগেম গত শনিবার একটি ফিরতি বল জালে জড়িয়ে দলকে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ২-১ ব্যবধানে এগিয়ে দিয়েছিলেন। বিশ্বকাপে প্রথমবারের মতো বড় কোনো সাফল্যের স্বপ্ন দেখা নরওয়ের জন্য সেই মুহূর্তটি ছিল উদযাপনের। কিন্তু ফরাসি রেফারি ক্লিমেন্ট টারপিন ভিডিও রিপ্লে দেখার পর গোলটি বাতিল করে দেন। রিপ্লেতে দেখা যায়, নরওয়ের তারকা আর্লিং হালান্ড ইংল্যান্ডের মিডফিল্ডার এলিয়ট অ্যান্ডারসনকে ধাক্কা দিয়েছিলেন, যা গোল তৈরির প্রক্রিয়ায় বাধা সৃষ্টি করে। যদিও হালান্ড সরাসরি খেলার সাথে যুক্ত ছিলেন না এবং অ্যান্ডারসনের পড়ে যাওয়ার বিষয়টি ছিল কিছুটা সন্দেহজনক।
ইংল্যান্ডের কাছে ২-১ গোলে হেরে বিদায় নেওয়া নরওয়ে ম্যাচটিতে ভিএআর (VAR) নিয়ে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছে। প্রথমার্ধের শেষদিকে জুড বেলিংহামের সমতাসূচক গোলটিও বাতিলের দাবি জানিয়েছিল তারা, কারণ বলটি গোল হওয়ার ঠিক আগে একটি ওভারহেড ক্যামেরা কেবলে লেগেছিল বলে ধারণা করা হচ্ছে। নরওয়ের অধিনায়ক মার্টিন ওডেগার্ড ম্যাচ শেষে সাংবাদিকদের বলেন, “রেফারির কাছ থেকে আমরা খুব একটা সাহায্য পাইনি।” হালান্ডের বাবা আলফ-ইঙ্গে হালান্ড সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এক্সে (সাবেক টুইটার) সরাসরি অসন্তোষ প্রকাশ করে লেখেন, “রেফারির বদৌলতে বেঁচে গেল ইংল্যান্ড। আশা করি বিশ্বকাপ জিতবে তোমরা, তবে আজ আমরা ডাকাতির শিকার হয়েছি।”
চলতি বিশ্বকাপের অন্যতম বড় আলোচনার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে ভিএআর প্রযুক্তি। লিওনেল মেসি বা ফ্রান্সের পারফরম্যান্স ছাপিয়ে বিতর্কিত ভিএআর সিদ্ধান্তগুলো ম্যাচের ভাগ্য বদলে দিচ্ছে। ক্রোয়েশিয়ান স্পোর্টস টেকনোলজি সাইট সোফাস্কোর ডট কমের অ্যান্টোনিও ভুকসানোভিচের মতে, নকআউট পর্বের শেষ পর্যন্ত ভিএআর ব্যবহার করে ১০০ বারেরও বেশি সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বা পরিবর্তন করা হয়েছে। ম্যাচপ্রতি গড়ে ০.৫টি সিদ্ধান্ত উল্টে দেওয়া হয়েছে, যা গত বিশ্বকাপ ও ক্লাব মৌসুমের চেয়েও বেশি।
খেলোয়াড় ও সমর্থকরা ভিএআর সিস্টেম নিয়ে বর্তমানে হতাশ। কখনো একটি সামান্য ট্যাকেলের জন্য লাল কার্ড দেওয়া হচ্ছে, আবার কখনো বড় ফাউলও উপেক্ষিত থাকছে। ইংল্যান্ডের কোচ টমাস টুখেল চলতি মাসের শুরুতে রেফারিং নিয়ে বিরক্তি প্রকাশ করে একে ‘অনিশ্চিত’ এবং ‘অগ্রহণযোগ্য’ বলে অভিহিত করেছেন।
ভিএআর-এর প্রেক্ষাপট
ভিএআর চালুর পেছনে সরাসরি একটি ঘটনার চেয়ে দুটি ঘটনা বেশি প্রভাব ফেলেছিল। প্রথমটি ২০১০ সালের বিশ্বকাপে ফ্রান্স ও আয়ারল্যান্ডের মধ্যকার প্লে-অফ ম্যাচ, যেখানে থিয়েরি অঁরি হাত দিয়ে বল নিয়ন্ত্রণে নিয়ে গোল তৈরি করেছিলেন। দ্বিতীয়টি ইংল্যান্ড ও জার্মানির মধ্যকার ম্যাচে ফ্র্যাঙ্ক ল্যাম্পার্ডের গোল, যা গোললাইন পার হওয়ার পরও রেফারি দেখেননি। এই ঘটনার পর ফিফা প্রযুক্তি ব্যবহারের দিকে ঝুঁকে পড়ে।
ভিএআর যেভাবে কাজ করে
ফিফার নিয়ম অনুযায়ী, মাঠের রেফারিদের সহায়তার জন্য ভিএআর ব্যবহার করা হয়, যাতে স্পষ্ট ভুল সংশোধন করা যায়। রিপ্লে কর্মকর্তারা গোল, লাল কার্ড, পেনাল্টি এবং কর্নার কিক রিভিউ করেন। অফসাইডের ক্ষেত্রে ‘সেমি-অটোমেটিক অফসাইড প্রযুক্তি’ ব্যবহার করা হয়, যা ক্যামেরা সেন্সরের মাধ্যমে নিখুঁত সিদ্ধান্ত প্রদান করে।
ভিএআর ও আর্জেন্টিনা বিতর্ক
সেমিফাইনালে ওঠা আর্জেন্টিনা দলটিকে নিয়ে বর্তমানে সবচেয়ে বেশি বিতর্ক চলছে। প্রতিপক্ষের সমর্থকরা মজা করে দলটিকে ‘ভিএআরজেন্টিনা’ বলে ডাকছে। আলজেরিয়ার বিপক্ষে ম্যাচে মেসি লাল কার্ড থেকে বেঁচে যাওয়া এবং মিশরের বিপক্ষে ম্যাচে ভিএআর-এর মাধ্যমে গোল বাতিলের বিষয়টি ফুটবল বিশ্বে সমালোচনার জন্ম দিয়েছে। মিশরীয় কোচ হোসাম হাসান ম্যাচ শেষে দাবি করেন, মেসিকে প্রতিযোগিতায় টিকিয়ে রাখতেই হয়তো পক্ষপাতমূলক সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। সুইজারল্যান্ডের বিপক্ষে ম্যাচেও রেফারির সিদ্ধান্ত নিয়ে সুইস কোচ মুরাত ইয়াকিন ক্ষোভ প্রকাশ করেছিলেন। তবে অনেক বিশেষজ্ঞের মতে, আর্জেন্টিনাকে দেওয়া অধিকাংশ সিদ্ধান্ত নিয়ম অনুযায়ীই সঠিক ছিল।
ক্রোয়েশিয়ার আক্ষেপ
ভিএআর নিয়ে সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগী ক্রোয়েশিয়া। পর্তুগালের বিপক্ষে ম্যাচের শেষ সময়ে ইগোর মাতানোভিচের মাথার সামান্য ছোঁয়ায় মারিও পাসালিচ অফসাইড পজিশনে চলে যান, যা উন্নত সেন্সর প্রযুক্তির মাধ্যমে ধরা পড়ে। নিয়মানুযায়ী সিদ্ধান্তটি সঠিক হলেও, এটি ফুটবলের স্বাভাবিক উত্তেজনাকে নষ্ট করেছে বলে মনে করছেন অনেকে।
ভিএআর প্রযুক্তি ফুটবলকে আরও নির্ভুল করছে, এতে কোনো সন্দেহ নেই। ভুল সিদ্ধান্ত বা অনিচ্ছাকৃত গোলগুলো এখন সহজে চিহ্নিত করা সম্ভব। তবে ফিফাকে এখন প্রয়োজন সিস্টেমটির সূক্ষ্ম পরিবর্তন আনা, যাতে কেবল অত্যন্ত স্পষ্ট ভুলগুলোর ক্ষেত্রেই এটি ব্যবহার করা হয়।
