ফকল্যান্ড দ্বীপপুঞ্জ নিয়ে বিতর্কিত ব্যানার: ফিফার শাস্তির মুখে আর্জেন্টিনা
বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে জয়ের পর আর্জেন্টিনার খেলোয়াড়রা ফকল্যান্ড দ্বীপপুঞ্জ নিয়ে একটি ব্যানার প্রদর্শন করেন। এই ঘটনার জেরে ফিফা আর্জেন্টিনা দলের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু করতে পারে।
আটলান্টায় অনুষ্ঠিত এই ম্যাচে বর্তমান বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা নাটকীয়ভাবে শেষ দিকে দুটি গোল করে থমাস টুখেলের দলকে ২-১ ব্যবধানে পরাজিত করে এবং রবিবারের ফাইনালে স্পেনের মুখোমুখি হওয়ার টিকিট নিশ্চিত করে। ম্যাচ শেষে আর্জেন্টিনার খেলোয়াড়রা মাঠে “Las Malvinas son Argentinas” লেখা একটি ব্যানার নিয়ে উদযাপন করেন, যার বাংলা অর্থ “ফকল্যান্ড আর্জেন্টিনার”।
দক্ষিণ-পশ্চিম আটলান্টিক মহাসাগরে অবস্থিত ব্রিটিশ শাসিত ফকল্যান্ড দ্বীপপুঞ্জ নিয়ে যুক্তরাজ্য ও আর্জেন্টিনার মধ্যে সার্বভৌমত্বের বিরোধ দীর্ঘদিনের। ডাউনিং স্ট্রিট এই বিষয়ে ফিফাকে তদন্তের আহ্বান জানিয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর সরকারি মুখপাত্র বলেছেন, “বিশ্বকাপ আমাদের না হলেও ফকল্যান্ড দ্বীপপুঞ্জ আমাদেরই। ফকল্যান্ডের প্রতি আমাদের অঙ্গীকার কখনোই নড়বে না।”
উল্লেখ্য, ১৯৮২ সালে আর্জেন্টিনার তৎকালীন সামরিক জান্তা নেতা জেনারেল লিওপোল্ডো গালতিয়েরির নির্দেশে আর্জেন্টিনার পূর্ব উপকূল থেকে ৩০০ মাইল দূরে অবস্থিত এই দ্বীপপুঞ্জ আক্রমণ করা হয়। ১৯৮২ সালের এপ্রিল থেকে জুন পর্যন্ত ৭৪ দিনের সেই যুদ্ধে ৬৫৫ জন আর্জেন্টাইন ও ২৫৫ জন ব্রিটিশ সেনা নিহত হন। এছাড়া দ্বীপপুঞ্জের তিন সাধারণ নাগরিকও প্রাণ হারান।
ফিফা কী ব্যবস্থা নিতে পারে?
২০১৪ সালে স্লোভেনিয়ার বিপক্ষে প্রীতি ম্যাচের আগে একই বার্তা সংবলিত ব্যানার প্রদর্শন করায় ফিফা আর্জেন্টিনা ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনকে ২০,০০০ পাউন্ড জরিমানা করেছিল। বিশ্ব ফুটবলের সর্বোচ্চ নিয়ন্ত্রক সংস্থা জানায়, এই কর্মকাণ্ড রাজনৈতিক প্রভাব এবং দলের অসদাচরণের নিয়ম লঙ্ঘন করেছে। সাধারণত টুর্নামেন্ট শেষ হওয়ার কয়েক সপ্তাহ পর ফিফা শৃঙ্খলাভঙ্গের বিষয়ে ব্যবস্থা নেয়, তাই আগামী কয়েক দিনের মধ্যে কোনো বড় পদক্ষেপ নেওয়ার সম্ভাবনা কম। তবে বিষয়টি বিশ্বকাপের মতো আসরে এবং দুই দেশের সরাসরি ম্যাচে ঘটায় ফিফা এটিকে গুরুত্ব সহকারে দেখতে পারে, যদিও আর্জেন্টিনার ফাইনাল খেলা নিয়ে কোনো শঙ্কা নেই।
লিবারেল ডেমোক্র্যাট নেতা এড ডেভি স্পেনের বিপক্ষে ফাইনাল ম্যাচে ব্যানার প্রদর্শনকারী খেলোয়াড়দের নিষিদ্ধ করার দাবি জানিয়েছেন। ফিফা প্রেসিডেন্ট জিয়ান্নি ইনফান্তিনোর কাছে পাঠানো এক খোলা চিঠিতে তিনি ইউরো ২০২৪-এ স্পেন খেলোয়াড় আলভারো মোরাতা এবং রদ্রি-কে এক ম্যাচের জন্য নিষিদ্ধ করার প্রসঙ্গ টেনেছেন, যারা “জিব্রাল্টার স্প্যানিশ” স্লোগান দিয়েছিলেন।
ফুটবল মাঠে রাজনৈতিক বার্তা সম্বলিত ব্যানার প্রদর্শনের ক্ষেত্রে ফিফার নিষেধাজ্ঞা দেওয়ার অতীত রেকর্ড রয়েছে। ২০১২ সালের অলিম্পিকের ব্রোঞ্জ পদক জয়ের পর দক্ষিণ কোরিয়ার মিডফিল্ডার পার্ক জং-উ কোরীয় ভাষায় “দোকদো আমাদের ভূখণ্ড” লেখা একটি সাইন প্রদর্শন করেছিলেন। পরে ফিফা তদন্ত করে তাকে দুই ম্যাচের জন্য নিষিদ্ধ করে। ২০২২ সালের কাতার বিশ্বকাপে ইংল্যান্ড, ওয়েলসসহ ইউরোপীয় দেশগুলো ‘ওয়ানলাভ’ আর্মব্যান্ড পরার পরিকল্পনা বাতিল করে, কারণ খেলোয়াড়দের হলুদ কার্ড দেখার হুমকি দেওয়া হয়েছিল।
ম্যাচ শেষে আর্জেন্টিনার মিডফিল্ডার লিয়ান্দ্রো পারেদেস ফকল্যান্ড যুদ্ধকে তাদের ইতিহাসের একটি “দুঃখজনক অধ্যায়” হিসেবে বর্ণনা করে বলেন, এই ম্যাচটি কেবল ফুটবল খেলার মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। আর্জেন্টিনার ভাইস-প্রেসিডেন্ট ভিক্টোরিয়া ভিলারোয়েলও এক্স হ্যান্ডলে (সাবেক টুইটার) বুধবারের জয়ের পর লিখেছেন, “এটি কেবল একটি সাধারণ ম্যাচ ছিল না।” তিনি আরও যোগ করেন, “ফকল্যান্ড আর্জেন্টিনার। তারা স্টেডিয়ামে ব্যানার নিতে নিষেধ করেছিল, কিন্তু তারা ভুলে গেছে আমরা এটি আমাদের রক্তে ও হৃদয়ে ধারণ করি।” ম্যাচের আগে ভিলারোয়েল বলেছিলেন, এই সেমিফাইনাল ছিল “আক্রমণকারীদের তাদের জায়গায় বসিয়ে দেওয়ার” লড়াই।
ব্যবসা ও বাণিজ্য বিষয়ক মন্ত্রী পিটার কাইল আর্জেন্টিনার ব্যানারের ঘটনাকে “পুরোপুরি অনুপযুক্ত” আখ্যা দিয়ে বলেছেন, তিনি আশা করেন ফিফা বিষয়টি পুঙ্খানুপুঙ্খ তদন্ত করবে। তিনি বিবিসি ব্রেকফাস্টকে বলেন, “আমার মনে হয় একটি তদন্ত নিশ্চিতভাবেই হবে, কারণ ফুটবলের মধ্যে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড না থাকার নিয়ম এটি একটি বড় লঙ্ঘন।”
ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীর সরকারি মুখপাত্র কাইলের মন্তব্যের সঙ্গে একমত পোষণ করলেও জানিয়েছেন যে, যেকোনো সম্ভাব্য ব্যবস্থা নেওয়াটা ফিফার এক্তিয়ার। তিনি আরও বলেন, “প্রধানমন্ত্রী ফাইনালের জন্য উভয় দলেরই শুভকামনা করছেন, বিশেষ করে স্পেনের জন্য।”
আর্জেন্টিনার খেলোয়াড়রা শেষ ষোলোতে মিশরের বিপক্ষে ৩-২ গোলের নাটকীয় জয়ের পর ফকল্যান্ড এবং আর্জেন্টিনার কিংবদন্তি ডিয়েগো ম্যারাডোনা ও লিওনেল মেসিকে নিয়ে স্লোগান দিয়েছিলেন। তবে সেমিফাইনালের আগে ম্যানেজার লিওনেল স্কালোনি বলেছিলেন, তিনি ফুটবল ও রাজনীতিকে মেলাতে চান না। তিনি আরও বলেন, “বাস্তবতা হলো এটি একটি ফুটবল ম্যাচ। আমি দুই বিষয়কে গুলিয়ে ফেলতে পারি না, বিশেষ করে এত বছর আগের ঘটনার প্রতি শ্রদ্ধা রেখে। এটি আমাদের ইতিহাসের একটি খুব দুঃখজনক সময় ছিল। আমরা কেবল একটি ফুটবল ম্যাচ খেলছি, আমাদের এই দুই বিষয়কে গুলিয়ে ফেলা উচিত নয়।”
দুই দেশের ঐতিহাসিক উত্তেজনার কারণে এই সেমিফাইনাল ম্যাচে নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছিল।
