প্রথমবার নারী আফ্রিকা কাপ অব নেশনস চ্যাম্পিয়ন ক্যামেরুন
টুর্নামেন্টের নবাগত মালাউইকে ৩-০ গোলে হারিয়ে নিজেদের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো নারী আফ্রিকা কাপ অব নেশনস (ওয়াফকন) শিরোপা জয় করেছে ক্যামেরুন।
মরক্কোর রাজধানী রাবাতে ২০তম মিনিটে মেরি এনগাহ মাঙ্গার ক্লোজ-রেঞ্জ হেডার থেকে এগিয়ে যায় ‘ইনডমিটেবল লায়োনেস’ খ্যাত ক্যামেরুন। এর ঠিক দশ মিনিট পর নাউমি ইতো দুর্দান্ত এক ভলিতে ব্যবধান দ্বিগুণ করেন।
প্রথমার্ধের ইনজুরি সময়ের তৃতীয় মিনিটে ক্যামেরুন তৃতীয় গোলটি পায়। নাউমি ইতো মালাউই গোলরক্ষক মার্সি সিকেলোকে কাটিয়ে বল বাড়িয়ে দেন স্ট্রাইকার এনগাহ মাঙ্গার দিকে, যিনি সহজে বল জালে জড়িয়ে এবারের আসরে নিজের পঞ্চম গোলটি পূর্ণ করেন।
বিশ্ব র্যাঙ্কিংয়ে ১৫৩তম স্থানে থাকা ওয়াফকন ২০২৬-এর সর্বনিম্ন র্যাংকধারী দল হিসেবে ফাইনালে জায়গা করে নিয়েছিল মালাউই। তারা মূলত তাদের দুই তারকা খেলোয়াড় চাবিথা এবং তেমওয়া চাউইংগা বোনদের আক্রমণভাগের ওপর ভরসা করেই ফাইনালে উঠেছিল।
তবে ক্যামেরুনের রক্ষণভাগ এই দুই তারকার ওপর কড়া নজর রাখায় মালাউই তাদের রূপকথার দৌড় শেষ করতে পারেনি।
দ্বিতীয়ার্ধের তিন মিনিটের মাথায় এনগাহ মাঙ্গা তার হ্যাটট্রিক পূর্ণ করার এবং গোল্ডেন বুট নিশ্চিত করার সহজ সুযোগ হাতছাড়া করেন। তিনি গোলরক্ষক সিকেলোকে পরাস্ত করলেও খালি পোস্টের পাশ দিয়ে বল বাইরে পাঠিয়ে দেন।
ঘণ্টাখানেকের কিছু সময় পর মালাউই গোল পাওয়ার সেরা সুযোগটি তৈরি করেছিল। ক্যামেরুন গোলরক্ষক মাইকেলি বিহিনা চাবিথা চাউইংগার একটি নিচু শট ঠেকিয়ে দেন এবং ফিরতি বলে তার ছোট বোন তেমওয়া শট নিলেও সেটি গোলপোস্টের বাইরে দিয়ে চলে যায়।
ক্যামেরুনের এই জয় অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ, কারণ তারা ২০২৪ সালের ওয়াফকন আসরে খেলার যোগ্যতা অর্জন করতে ব্যর্থ হয়েছিল। দ্বিতীয় রাউন্ডে আলজেরিয়ার কাছে ৩-১ ব্যবধানে হেরে তারা বাদ পড়েছিল।
তবে আফ্রিকান ফুটবল কনফেডারেশন (ক্যাফ) ফাইনাল রাউন্ডের দল ১২ থেকে ১৬-তে উন্নীত করায় র্যাঙ্কিংয়ের ভিত্তিতে এই টুর্নামেন্টে খেলার সুযোগ পায় ক্যামেরুন।
ফিফা প্রেসিডেন্ট জিয়ান্নি ইনফান্তিনো এবং ক্যাফ প্রেসিডেন্ট প্যাট্রিস মোৎসেপে ট্রফি তুলে দেন বিজয়ী দলের হাতে। নাইজেরিয়া, নিরক্ষীয় গিনি ও দক্ষিণ আফ্রিকার পর চতুর্থ দেশ হিসেবে এই শিরোপা জিতে ক্যামেরুন ২০ লাখ ডলার প্রাইজমানি লাভ করেছে।
উভয় দলই ২০২৭ সালে ব্রাজিলে অনুষ্ঠিতব্য নারী ফিফা বিশ্বকাপে অংশগ্রহণ করবে। সাথে থাকবে ওয়াফকনের সেমিফাইনালিস্ট আলজেরিয়া ও মরক্কো।
“আমরা খুবই আনন্দিত,” এনগাহ মাঙ্গা ই৪-এর কাছে নিজের অনুভূতি প্রকাশ করেন।
“এখানে পৌঁছানোর জন্য আমরা দীর্ঘ কয়েক বছর ধরে কঠোর পরিশ্রম করেছি। শেষ পর্যন্ত চ্যাম্পিয়ন হতে পেরে আমরা গর্বিত।”
ভুলের সুযোগ কাজে লাগাল ইনডমিটেবল লায়োনেস
রাবাতে ক্যামেরুনের তিনটি গোলই তৈরি করে দিয়েছেন নাউমি ইতো [ইপিএ]
ম্যাচের শুরুতে উভয় দলই স্নায়ুচাপে ভুগছিল। মালাউই তাদের সেমিফাইনাল জয়ের কৌশলের পুনরাবৃত্তি ঘটিয়ে তেমওয়া চাউইংগাকে লক্ষ্য করে লম্বা পাস দিচ্ছিল।
প্রথম গোলটি আসে যখন মালাউই গোলরক্ষক সিকেলো ইতোর একটি ক্রস ঠিকমতো ধরতে পারেননি এবং গ্রেস মেনডুয়ার হেডার গোলবারের পোস্টে লেগে ফিরে আসে। এনগাহ মাঙ্গা সেই সুযোগ কাজে লাগিয়ে গোল করেন। র্যাঙ্কিংয়ে ৮২ ধাপ এগিয়ে থাকা ক্যামেরুন এরপর আর পিছু ফিরে তাকায়নি।
ক্যামেরুনের দ্বিতীয় গোলটি আসে কর্নার ক্লিয়ার করতে মালাউই ব্যর্থ হওয়ায়। ইতো দুর্দান্ত শটে বল জালে পাঠান। তৃতীয় গোলটির ক্ষেত্রেও সিকেলোর ভুল ছিল, তিনি অহেতুক পোস্ট ছেড়ে বেরিয়ে আসেন এবং ইতো সহজেই বল বাড়িয়ে দেন এনগাহ মাঙ্গার জন্য, যিনি খালি পোস্টে হেডে গোল করেন।
জুন মাসে দায়িত্ব নেওয়া ক্যামেরুন কোচ ভ্যালেন্টাইন এনগুয়েলে একটি সুশৃঙ্খল দল গড়ে তুলেছেন। তার অধীনে দলটি কোয়ার্টার ফাইনালে নাইজেরিয়াকে ১-০ গোলে এবং সেমিফাইনালে আয়োজক মরক্কোকে পেনাল্টি শুটআউটে হারিয়েছে।
বেনফিকার ২২ বছর বয়সী গোলরক্ষক বিহিনা এই টুর্নামেন্ট জুড়ে অসাধারণ পারফর্ম করেছেন। যদিও ফাইনালে মালাউই সেভাবে চাপ সৃষ্টি করতে পারেনি।
শেষ দিকে ক্যামেরুন আরও একটি গোল করতে পারত, কিন্তু ইতোর শট সিকেলো বাঁচিয়ে দেন। ইনজুরি সময়ে বদলি খেলোয়াড় গ্যাব্রিয়েল অনগুয়েন গোল করলেও অফসাইডের কারণে তা বাতিল হয় এবং জার্সি খোলার কারণে তিনি হলুদ কার্ড দেখেন।
ম্যাচ শেষে ক্যামেরুন ফুটবল ফেডারেশনের প্রেসিডেন্ট স্যামুয়েল ইতো মাঠে এসে উদযাপনে যোগ দেন। এর আগে ২০০৪, ২০১৪ এবং ২০১৬ সালে ফাইনাল হারলেও এবার ক্যামেরুন প্রথম শিরোপা জয়ের স্বাদ পেল।
টুর্নামেন্ট সম্প্রসারণের সিদ্ধান্ত সফল
এই টুর্নামেন্টটি ছিল নারী ফুটবলের ইতিহাসে অন্যতম স্মরণীয় আসর। আয়োজক মরক্কো ছাড়া কেউ আশা করেনি যে এই চার দল সেমিফাইনালে উঠবে।
ক্যাফের ১৬ দল নিয়ে টুর্নামেন্ট করার সিদ্ধান্ত যথার্থ প্রমাণিত হয়েছে। এর ফলে নাইজেরিয়া ও দক্ষিণ আফ্রিকার মতো জায়ান্টদের বাইরেও অন্য দলগুলো নিজেদের দক্ষতা প্রমাণের সুযোগ পেয়েছে।
ক্যামেরুনের তরুণ দলটি মাঝমাঠে মনিক এনগকের অসাধারণ পারফরম্যান্সে ম্যাচ নিয়ন্ত্রণ করেছে। অন্যদিকে, ১৫৩ র্যাঙ্কিংয়ের দল মালাউই শেষ পর্যন্ত তাদের রক্ষণের ভুলে হেরেছে।
ব্রাজিলে অনুষ্ঠিতব্য পরবর্তী নারী ফুটবল বিশ্বকাপে এই দুই দলসহ মরক্কো ও আলজেরিয়া মহাদেশের প্রতিনিধিত্ব করবে। গত ১৩ মাসে আলজেরিয়া দারুণ উন্নতি করেছে এবং সামনের দিনগুলোতে আফ্রিকান ফুটবল আরও ভালো কিছুর দাবি রাখে।
