২০২৬ বিশ্বকাপ ঘিরে আকাশপথে প্রায় ৬০ হাজার মাইল ভ্রমণ জিয়ান্নি ইনফান্তিনোর
এক দিনে একাধিক ফ্লাইট। প্রায় ৬০,০০০ মাইল ভ্রমণ এবং ১০০ ঘণ্টারও বেশি সময় আকাশপথে কাটানো। ২০২৬ বিশ্বকাপের আয়োজক হিসেবে তিনটি দেশ, ১৬টি শহর এবং চারটি টাইম জোনের বিস্তৃতি জুড়ে ফিফা প্রেসিডেন্ট জিয়ান্নি ইনফান্তিনো আকাশপথে প্রচুর সময় ব্যয় করেছেন। রোববার নিউ জার্সিতে অনুষ্ঠিত ফাইনাল ম্যাচ দিয়ে শেষ হতে যাওয়া এই টুর্নামেন্টের বিভিন্ন ম্যাচ, সভা এবং অন্যান্য অনুষ্ঠানে যোগ দিতে তিনি পুরো উত্তর আমেরিকা চষে বেড়িয়েছেন।
ইনফান্তিনোর ভ্রমণের তথ্য ট্র্যাক করতে অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস (এপি) গত কয়েক বছরে তার ব্যবহৃত ব্যক্তিগত বিজনেস জেটের ফ্লাইট লগ বিশ্লেষণ করেছে। পাশাপাশি এপি ফটোগ্রাফারদের তোলা ছবি এবং ফিফা ও খোদ ইনফান্তিনোর নিজের ইনস্টাগ্রামে পোস্ট করা ছবিও খতিয়ে দেখা হয়েছে। এই বিশ্লেষণ অনুযায়ী, আর্জেন্টিনা বা স্পেন—যেই চ্যাম্পিয়ন হোক না কেন, টুর্নামেন্ট শেষ হওয়ার আগেই ইনফান্তিনো পৃথিবী প্রায় আড়াইবার প্রদক্ষিণ করার মতো দূরত্ব পাড়ি দিয়েছেন।
ইনফান্তিনোর এই ব্যাপক বিমান ভ্রমণের সুযোগ করে দিয়েছে কাতারি সরকারের বহরে থাকা একটি গালফস্ট্রিম জি৬৫০ জেট। বিমানটি পরিচালনা করে কাতার এয়ারওয়েজের ব্যক্তিগত চার্টার বিভাগ, যারা এবারের বিশ্বকাপের অন্যতম স্পনসর।
ফ্লাইট ট্র্যাকিং সাইট ‘ফ্লাইটঅ্যাওয়ের’-এর তথ্যমতে, টুর্নামেন্টের উদ্বোধনী ম্যাচের আগে ৯ জুন লস অ্যাঞ্জেলেস থেকে মেক্সিকো সিটি যাত্রার পর থেকে বিমানটি গড়ে প্রতিদিন একটির বেশি ফ্লাইট পরিচালনা করেছে এবং অনেক দিন এটি তিনবারের বেশিও উড়েছে।
ম্যাচ দেখার পাশাপাশি ইনফান্তিনোর সফরসূচিতে নিউ ইয়র্কে ‘ফক্স অ্যান্ড ফ্রেন্ডস’ অনুষ্ঠানে সাক্ষাৎকার এবং মায়ামিতে ফিফা সম্মেলনে অংশ নেওয়া অন্তর্ভুক্ত ছিল। ওই সম্মেলনে সংস্থাটির ২১১টি সদস্য অ্যাসোসিয়েশনের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন। এছাড়া তিনি কাতারের সাবেক আমিরের জানাজায় অংশ নিতে দোহাতেও গিয়েছিলেন এবং বিশ্বকাপের সেমিফাইনালের আগেই আবার যুক্তরাষ্ট্রে ফিরে আসেন।
ইনফান্তিনোর এই ভ্রমণসূচি ও ব্যবস্থাপনা নিয়ে মন্তব্যের জন্য ইমেইলে অনুরোধ করা হলেও ফিফা কোনো সাড়া দেয়নি।
যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকো জুড়ে ১০৪টি ম্যাচের রেকর্ড গড়া এই টুর্নামেন্টে ইনফান্তিনোর করা কিছু ভ্রমণের হিসাব নিচে তুলে ধরা হলো:
৪৩টি ম্যাচ
রোববারের ফাইনালের আগে পর্যন্ত ইনফান্তিনো ৪৩টি বিশ্বকাপ ম্যাচ দেখেছেন। ফ্লাইটঅ্যাওয়ের দেখাচ্ছে যে, ইংল্যান্ড ও ফ্রান্সের মধ্যকার তৃতীয় স্থান নির্ধারণী ম্যাচ দেখার জন্য গালফস্ট্রিম জেটটি নিউ জার্সি থেকে মায়ামি যাওয়ার কথা থাকলেও শেষ পর্যন্ত তা উড়তে পারেনি। ফেডারেল এভিয়েশন অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের তথ্য অনুযায়ী, শনিবার নিউ ইয়র্কের বিমানবন্দরগুলোতে বজ্রপাতের কারণে ফ্লাইট বিলম্বিত হয়েছিল।
১৬টি স্টেডিয়াম
বিশ্বকাপের ১৬টি ভেন্যুর প্রতিটিতেই ইনফান্তিনো অন্তত একটি ম্যাচ দেখেছেন। মায়ামির হার্ড রক স্টেডিয়ামে তিনি সবচেয়ে বেশি পাঁচবার ম্যাচ দেখেছেন।
একই দিনে একাধিক ম্যাচ
ইনফান্তিনো একাধিক দিন দুটি করে ম্যাচ দেখেছেন, যার জন্য তাকে প্রায়শই কয়েকশ মাইল দূরবর্তী স্টেডিয়ামে ভ্রমণ করতে হয়েছে।
২১টি বিমানবন্দর
টুর্নামেন্ট চলাকালীন গালফস্ট্রিম জেটটি মূলত আয়োজক শহরগুলোর প্রধান আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরগুলো ব্যবহার করেছে। তবে কখনও কখনও আটলান্টার ফুলটন কাউন্টি এক্সিকিউটিভ এয়ারপোর্ট এবং মায়ামির ওপা লকা এক্সিকিউটিভ এয়ারপোর্টের মতো ছোট বিজনেস এয়ারপোর্টগুলোও ব্যবহৃত হয়েছে।
২৩টি আন্তর্জাতিক সীমান্ত
সেমিফাইনাল পর্যন্ত উত্তর আমেরিকার মধ্যে বিমানটি ২৩ বার আন্তর্জাতিক সীমান্ত অতিক্রম করেছে।
১১৫ ঘণ্টা আকাশপথে
টুর্নামেন্ট চলাকালীন গালফস্ট্রিম জেটটি ১১৫ ঘণ্টা আকাশে থেকেছে। এর মধ্যে কাতারে জানাজায় অংশ নেওয়ার জন্য ২৯ ঘণ্টার ভ্রমণ এবং বিমান সরানোর ফ্লাইটগুলো অন্তর্ভুক্ত নয়। এই সময় প্রায় পাঁচ দিনের সমান এবং বাণিজ্যিক বিমানে নিউ ইয়র্ক থেকে লস অ্যাঞ্জেলেসে ২০ বার যাতায়াতের সমান।
৫ ঘণ্টা ৪৪ মিনিট
কাতারের যাত্রা বাদ দিলে, সবচেয়ে দীর্ঘ ফ্লাইটের সময় ছিল ৩৪৪ মিনিট বা ৫ ঘণ্টা ৪৪ মিনিট। মায়ামি থেকে সিয়াটলের সেই ফ্লাইটে তিনি ১৫ জুন বেলজিয়াম বনাম মিশর ম্যাচ দেখতে গিয়েছিলেন। এই ফ্লাইটের সময়কাল তিনটি পূর্ণাঙ্গ বিশ্বকাপ ম্যাচের সমান।
২৮ মিনিট
সবচেয়ে সংক্ষিপ্ত ফ্লাইট ছিল ৬ জুলাই সিয়াটল থেকে ভ্যাঙ্কুবার পর্যন্ত, যা মাত্র ২৮ মিনিট স্থায়ী ছিল। ওই দিন সিয়াটলে যুক্তরাষ্ট্র বনাম বেলজিয়াম ম্যাচ দেখার পরদিন তিনি ভ্যাঙ্কুভারে সুইজারল্যান্ড বনাম কলম্বিয়া ম্যাচ দেখতে গিয়েছিলেন।
৫৯,২৮১ মাইল (৯৫,৪০৩ কিলোমিটার)
এপি বিশ্লেষণ অনুযায়ী, টুর্নামেন্ট চলাকালীন বিমানটি কাতারের যাত্রা বাদে এই দূরত্ব অতিক্রম করেছে। এটি নিউ ইয়র্ক-সিঙ্গাপুর, লস অ্যাঞ্জেলেস-দোহা এবং লন্ডন-পার্থের সম্মিলিত দূরত্বের চেয়েও বেশি।
৫,৭৭২ মাইল (৯,২৮৯ কিলোমিটার)
এক দিনে সর্বোচ্চ ভ্রমণের রেকর্ড ২৬ জুনের। সেদিন সকালে মায়ামি থেকে ডালাস যান তিনি। এরপর সেখান থেকে সিয়াটলে গিয়ে মিশর বনাম ইরান ম্যাচ দেখেন। রাতে সিয়াটল থেকে রওনা হয়ে পরদিন সকালে মায়ামিতে পৌঁছান, যেখানে তিনি কলম্বিয়া বনাম পর্তুগাল ম্যাচটি দেখেন।
৫০ শতাংশ
ফিফা ২০৩০ সালের মধ্যে বিশ্বকাপ এবং সংশ্লিষ্ট কার্যক্রম থেকে কার্বন নিঃসরণ অর্ধেক কমানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছে এবং ২০৪০ সালের মধ্যে নেট-জিরো নিঃসরণে পৌঁছানোর লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। সংস্থাটির ২০২৬ বিশ্বকাপ সাসটেইনেবিলিটি এবং মানবাধিকার কৌশলে জলবায়ু পরিবর্তনের মোকাবিলায় প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হওয়ার কথা বলা হয়েছে।
পরিবেশকর্মী এবং জলবায়ু গবেষকরা দাবি করছেন যে, তিনটি দেশ জুড়ে এই টুর্নামেন্ট আয়োজনের ফলে প্রচুর পরিমাণে গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গত হচ্ছে। খেলোয়াড়, দর্শক ও কর্মকর্তাদের ব্যাপক বিমান ভ্রমণের কারণে এটি ইতিহাসের সবচেয়ে বেশি কার্বন নিঃসরণকারী বিশ্বকাপ হতে পারে বলে তাদের আশঙ্কা।
