প্রিমিয়ার লিগে ঘুরে দাঁড়াতে দলবদলের কৌশলে বড় পরিবর্তন আনল ইপসউইচ টাউন
নতুনভাবে প্রিমিয়ার লিগে উন্নীত ইপসউইচ টাউন এই গ্রীষ্মে দলবদলের বাজারে বড় অঙ্কের অর্থ ব্যয় করেছে। চেলসি, টটেনহ্যাম এবং আর্সেনালের পরেই প্রিমিয়ার লিগের চতুর্থ সর্বোচ্চ নেট ব্যয়কারী দল হিসেবে নিজেদের নাম লিখিয়েছে ক্লাবটি।
ইপসউইচ নতুন ১০ জন খেলোয়াড়কে দলে নিয়েছে, যার সম্মিলিত মূল্য ১০৬.৬ মিলিয়ন পাউন্ড। নতুন কোচ গ্যারি ও’নিলের অধীনে ‘ট্রাক্টর বয়েজ’ খ্যাত এই দলটি তাদের রিক্রুটমেন্ট বা খেলোয়াড় কেনার কৌশলে আমূল পরিবর্তন এনেছে। ২০২৪-২৫ মৌসুমে শীর্ষ লিগে তাদের তিক্ত অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়েই মূলত এই পরিবর্তন আনা হয়েছে।
১০ জুন দায়িত্ব ছেড়ে দেওয়া জনপ্রিয় কোচ কিয়েরান ম্যাকেনার অধীনে দলটি মূলত ব্রিটিশ ও আইরিশ খেলোয়াড়দের ওপরই বেশি নির্ভর করত। চার বছর ধরে কোচ থাকার সময়ে ইপসউইচ ৩৯ জন স্থায়ী খেলোয়াড় সই করায়, যার মধ্যে ৩২ জনই ছিল ব্রিটেন বা আয়ারল্যান্ডের। সরাসরি ইউরোপের ক্লাব থেকে আসা খেলোয়াড় ছিল মাত্র দুজন।
তবে ঘরোয়া প্রতিভাবান খেলোয়াড়দের আকাশচুম্বী দামের কারণে চ্যাম্পিয়নশিপ ও প্রিমিয়ার লিগের মধ্যকার বিশাল ব্যবধান ঘুচিয়ে ফেলা কঠিন। গত মৌসুমে সান্ডারল্যান্ড এবং লিডস ইউনাইটেডের সাফল্য দেখিয়ে দিয়েছে যে, প্রিমিয়ার লিগে টিকে থাকতে হলে দলবদলের বাজারে সঠিক মূল্যে খেলোয়াড় খোঁজা অত্যন্ত জরুরি।
২০২৪ সালে যখন ইপসউইচ সর্বশেষ প্রিমিয়ার লিগে উঠেছিল, তখন তাদের ১২ জন নতুন খেলোয়াড়ের মধ্যে ১০ জনই ছিল ব্রিটিশ বা আইরিশ। এবার ক্লাবটি তাদের দলবদলের জাল অনেক দূর ছড়িয়েছে। এমারসন ও ফ্লোরেন্টিনো লুইস ক্লাবের ইতিহাসের প্রথম ব্রাজিলিয়ান খেলোয়াড় হতে যাচ্ছেন। এছাড়া সাশা লুকিচ প্রথম সার্বিয়ান এবং দাইজেন মায়েদা প্রথম জাপানি খেলোয়াড় হিসেবে দলে যোগ দিয়েছেন।
নতুন সই করা ১০ জন খেলোয়াড়ের মধ্যে একমাত্র ব্রিটিশ খেলোয়াড় হলেন আয়াক্স থেকে আসা চুবা আকপম। তবে এটিও ছিল বাধ্যবাধকতা থেকে করা একটি চুক্তি।
ইপসউইচের সাফল্যের নেপথ্যে যে কৌশল
ইপসউইচের পুরনো রিক্রুটমেন্ট মডেল লিগ ওয়ান থেকে চলে আসছিল। ২০২৩ সালে চ্যাম্পিয়নশিপে ফেরার পর ম্যাকেনা জানিয়েছিলেন, ইংল্যান্ডের তৃতীয় সারির লিগের গতিময় প্রকৃতির কারণে তারা সচেতনভাবেই বিদেশি খেলোয়াড় না নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন।
সেই স্কোয়াড নিয়েই ইপসউইচ প্রিমিয়ার লিগে উঠেছিল। সে সময় ক্লাব কর্তৃপক্ষ তাদের কৌশল পরিবর্তন না করে বরং চ্যাম্পিয়নশিপে নজরকাড়া তরুণ ব্রিটিশ খেলোয়াড়দের ওপরই আস্থা রেখেছিল। ওমারি হাচিনসন, জ্যাক ক্লার্ক, লিয়াম ডেলাপ, দারা ও’শিয়া এবং জ্যাকব গ্রিভসের মতো খেলোয়াড়দের জন্য প্রায় ১০০ মিলিয়ন পাউন্ড খরচ করা হয়েছিল।
যদিও সে মৌসুমে দলটি রেলিগেশনের কবলে পড়েছিল, তবুও দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনার কথা বলেছিলেন ম্যাকেনা। সে সময় খেলোয়াড়দের উচ্চ বেতন সত্ত্বেও ইপসউইচের ৭৭ মিলিয়ন পাউন্ডের বেতন কাঠামো ছিল প্রিমিয়ার লিগের মধ্যে সর্বনিম্ন। এমনকি রেলিগেশনের পরেও ক্লাবটি ৪ মিলিয়ন পাউন্ড প্রাক-কর মুনাফা অর্জন করে।
পরবর্তীতে ও’শিয়া, ক্লার্ক, গ্রিভস এবং জানুযারি ২০২৫-এ আসা জ্যাডেন ফিলোজিন দলের গুরুত্বপূর্ণ সদস্য হিসেবে প্রিমিয়ার লিগে তাৎক্ষণিক প্রত্যাবর্তনে মূল ভূমিকা পালন করেন।
এখন আরও সাহসী হওয়ার সময়
ক্লাবের চেয়ারম্যান মার্ক অ্যাশটন মনে করেন, প্রিমিয়ার লিগে টিকে থাকতে হলে এখন তাদের আরও সাহসী হতে হবে। সেই লক্ষ্যেই জাপানি অ্যাটাকার মায়েদা এবং মরক্কোর সেন্টার-ব্যাক ইসা ডিওপকে দলে নেওয়া হয়েছে। প্যারাগুয়ের ফরোয়ার্ড জুলিও এনসিসোকেও দলে নেওয়ার গুঞ্জন রয়েছে।
সাবেক বোর্নমাউথ ও উলভস বস ও’নিল খুব দ্রুত একটি শক্তিশালী দল গঠন করতে চাইছেন। গত মাসে তিনি বলেছিলেন, “দুই মৌসুম আগে আমরা লিগে টিকে থাকার ধারেকাছেও ছিলাম না। এবার আমাদের ভালো করতে হবে। এজন্যই আমরা বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে মানসম্পন্ন খেলোয়াড় দলে নেওয়ার চেষ্টা করছি।” গত শনিবার রায়ো ভালেকানোর বিপক্ষে ৩-০ গোলের জয়ের পর ও’নিল আরও নতুন খেলোয়াড় আনার ইঙ্গিত দিয়েছেন।
নতুন খেলোয়াড়রা কি সফল হবেন?
অ্যাশটন স্বীকার করেছেন যে, তাদের দলের অন্যতম ঘাটতি ছিল শারীরিক সক্ষমতা। মাঝমাঠে শক্তি ও বল দখলের লড়াইয়ে দলটি পিছিয়ে ছিল। নতুন যোগ দেওয়া ফ্লোরেন্টিনো লুইস এবং সাশা লুকিচকে সেই ঘাটতি পূরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে হবে।
ক্লাব তাদের দলবদলের রেকর্ড ভেঙে ২২ বছর বয়সী ব্রাজিলিয়ান স্ট্রাইকার এমারসনকে ২৪ মিলিয়ন পাউন্ডে সই করিয়েছে। এছাড়া সেলটিক থেকে আসা জাপানি ফরোয়ার্ড মায়েদাও দলের অন্যতম ভরসা। এমনকি প্রিমিয়ার লিগের দীর্ঘতম খেলোয়াড় হিসেবে গোলরক্ষক কিয়েল শেরপেনকে সই করিয়ে চমক দিয়েছে ইপসউইচ।
নতুন কোচ, উন্নত প্রশিক্ষণ মাঠ এবং বড় অঙ্কের বিনিয়োগের পর এই মৌসুম ইপসউইচের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এখন দেখার বিষয়, তাদের এই বিনিয়োগ এবং দলবদলের কৌশল শেষ পর্যন্ত ক্লাবকে শীর্ষ লিগে দীর্ঘস্থায়ী সাফল্য এনে দিতে পারে কি না।
