ইংল্যান্ড বনাম আর্জেন্টিনা: ফুটবল ম্যাচের বাইরে কি অন্য কিছু?
সুইজারল্যান্ডের বিপক্ষে নাটকীয়ভাবে অতিরিক্ত সময়ে কোয়ার্টার ফাইনাল জয়ের দুই মিনিটের মধ্যেই আর্জেন্টিনা কোচ লিওনেল স্কালোনির কাছে সেমিফাইনাল নিয়ে প্রশ্ন আসতে শুরু করে। সেখানে তাদের প্রতিপক্ষ হিসেবে সামনে ছিল চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী ইংল্যান্ড।
স্প্যানিশ ভাষায় এক সাংবাদিক তাকে প্রশ্ন করেন, “ফুটবলের দৃষ্টিকোণ থেকে তো বটেই, আবেগের দিক থেকেও এটি কি একটি বিশেষ ম্যাচ হবে না? আপনি ও আপনার খেলোয়াড়রা কীভাবে এই ম্যাচের জন্য প্রস্তুত হবেন এবং আর্জেন্টাইনদের উদ্দেশ্যে আপনার বার্তা কী?”
স্কালোনি সাংবাদিকের কথা মাঝপথেই থামিয়ে দেন। তিনি বেশ রুক্ষভাবে বলেন, “এটি কেবল একটি ফুটবল ম্যাচ, ঠিক আছে? বার্তাটি হলো, এটি একটি ফুটবল ম্যাচ। অন্য কিছু খোঁজার দরকার নেই। এটি একটি ফুটবল ম্যাচ।”
চল্লিশ বছর আগে ১৯৮৬ সালের বিশ্বকাপ কোয়ার্টার ফাইনালে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ম্যাচের আগে ডিয়েগো আরমান্দো ম্যারাডোনাও সংবাদমাধ্যমের মুখোমুখি হয়েছিলেন। সে সময় অনেক সাংবাদিক ম্যাচটিকে ফকল্যান্ড যুদ্ধের একটি প্রতিচ্ছবি হিসেবে উপস্থাপন করেছিলেন। চার বছর আগের সেই ৭৪ দিনের যুদ্ধে ৬৪৯ জন আর্জেন্টাইন ও ২৫৫ জন ব্রিটিশ সৈন্যসহ বেশ কয়েকজন প্রাণ হারিয়েছিলেন। আর্জেন্টাইনদের কাছে ফকল্যান্ড দ্বীপপুঞ্জ, যা তাদের কাছে ‘মালভিনা’ নামে পরিচিত, সেটি ছিল একটি গভীর ক্ষত।
ম্যারাডোনা তখন বলেছিলেন, “এটি কেবল একটি ম্যাচ, ঠিক আছে?” এরপর তিনি কয়েক দশক পর স্কালোনির মতোই বারবার একই কথা বলেছিলেন।
ম্যারাডোনার সতীর্থদের ভাষ্যমতে, পরদিন অ্যাজটেকা স্টেডিয়ামে মাঠে নামার আগ পর্যন্ত তিনি এই বক্তব্যেই অটল ছিলেন। প্রয়াত ডিফেন্ডার হোসে লুইস ব্রাউন মৃত্যুর আগে স্মরণ করেছিলেন, “ডিয়েগো আমাদের লাইনে হাঁটার সময় চিৎকার করছিল। সে বলছিল, ‘চলো, হ্যাঁ? এই বদমাশরা আমাদের প্রতিবেশীদের মেরেছে, আমাদের আত্মীয়দের মেরেছে।’ আমি বিষয়টি বুঝছিলাম। জাতীয় সংগীতের পর আমরা কেউ কিছু বলিনি। ম্যাচের আগে আমরা এটি নিয়ে কথা না বললেও সবাই সেটাই ভাবছিলাম। আমরা শুধু মাঠে গিয়ে দৌড়েছিলাম।”
বুধবারের ইংল্যান্ড-আর্জেন্টিনা সেমিফাইনাল অবশ্যই শুধু একটি খেলা নয়। ইংল্যান্ডের কাছে এটি এখন আর ফকল্যান্ড যুদ্ধ নয়, কিন্তু আর্জেন্টাইনদের কাছে স্মৃতিতে সেই সংঘাত এখনো অমলিন। ২০২৭ সালে ম্যারাডোনার মৃত্যুর পরও তিনি আর্জেন্টিনার ফুটবল আবেগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন। স্টেডিয়ামে সমর্থকদের হাতে মেসির পাশাপাশি এখনো ম্যারাডোনার ছবি দেখা যায়। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার কল্যাণে অনলাইনে মেসির সাথে ম্যারাডোনার স্বর্গীয় সাক্ষাতের ছবিও ছড়িয়ে পড়েছে।
এবারের বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনা সমর্থকদের মধ্যে ম্যারাডোনার ইংল্যান্ডবিরোধী মানসিকতা নতুন প্রজন্মের কাছে সোশ্যাল মিডিয়ার মাধ্যমে পৌঁছেছে। ১৯৮৬ সালের সেই ঐতিহাসিক গোল উদযাপন কিংবা ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে খেলার সময় বন্দুক নিয়ে প্রতিশোধ নেওয়ার সেই পুরোনো কথাগুলো ফের আলোচনায় আসছে। এমনকি ২০১৮ ও ১৯৬৬ সালের বিশ্বকাপ জয় নিয়েও ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে তারা ক্ষোভ প্রকাশ করে আসছে।
মিসরের বিপক্ষে জয়ের পর আর্জেন্টাইন খেলোয়াড়রা ড্রেসিংরুমে ‘লা কুয়ার্তা এস্ত্রেয়া’ (চতুর্থ তারকা) গানটি গেয়েছিল, যেখানে মালভিনা ও ডিয়েগোর নাম উঠে আসে। এই গানটি বিশ্বকাপের অনেক আগে থেকেই আর্জেন্টিনা সমর্থকদের কাছে জনপ্রিয়।
ম্যারাডোনার প্রভাব এবং দীর্ঘদিনের এই প্রতিদ্বন্দ্বিতা আর্জেন্টাইন দলকে বাড়তি অনুপ্রেরণা জোগাচ্ছে। এবারের বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনা দল খুব একটা ছন্দে নেই এবং দুবার তারা প্রায় বিদায়ের মুখে ছিল। বিশৃঙ্খলার মধ্য দিয়েই যেন তারা সেমিফাইনাল পর্যন্ত পৌঁছেছে।
লিওনেল মেসি এর আগে কখনো ইংল্যান্ডের বিপক্ষে খেলেননি। শনিবার সুইজারল্যান্ডকে হারানোর পর সাংবাদিকরা তাকে ইংল্যান্ড সম্পর্কে প্রশ্ন করলে তিনি বলেন, “এটি একটি বিশেষ ম্যাচ, কারণ ইংল্যান্ডের বিপক্ষে এটিই আমার প্রথম খেলা। আমি প্রায় সব বড় দলের বিপক্ষেই খেলেছি, কিন্তু তাদের সাথে খেলা হয়নি। ইংল্যান্ড ফুটবলের অন্যতম শক্তি, তাই বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে এমন দলের মুখোমুখি হওয়া সবসময়ই উত্তেজনার।”
মেসির এই কূটনৈতিক উত্তর ছিল প্রত্যাশিত। তবে এটা স্পষ্ট যে, আর্জেন্টিনার জার্সিতে এটি তার শেষ গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচ হতে পারে। স্কালোনি বা ম্যারাডোনার মতোই মেসিও যে আবেগের কথা আড়াল করছেন, তা সবারই জানা।
