নতুন কোচ নিয়ে প্রিমিয়ার লিগের ইতিহাসে রেকর্ড গড়ছে নয় ক্লাব
২০২৬-২৭ প্রিমিয়ার লিগ মৌসুম শুরু হতে এখনও কিছুটা সময় বাকি থাকলেও, এটি এখনই ইতিহাস গড়ে ফেলেছে। প্রিমিয়ার লিগের ইতিহাসে এবারই প্রথমবার নয়টি ক্লাব তাদের নতুন স্থায়ী কোচ নিয়ে নতুন মৌসুম শুরু করতে যাচ্ছে। লিগের উদ্বোধনী সপ্তাহে এটিই এখন পর্যন্ত সর্বোচ্চ।
লিভারপুল এবং ম্যানচেস্টার সিটি থেকে শুরু করে নিউক্যাসল ইউনাইটেড এবং চেলসি—লিগের প্রায় অর্ধেক দলেই বড় ধরনের পরিবর্তনের ছোঁয়া লেগেছে।
নয় ক্লাব, নয় গল্প
এই ব্যাপক রদবদল প্রিমিয়ার লিগের কোচিংয়ের দৃশ্যপটকে পুরোপুরি বদলে দিয়েছে। আর্নে স্লটকে বরখাস্ত করার পর লিভারপুল কোচ হিসেবে নিয়োগ দিয়েছে আন্দোনি ইরাওলাকে। ইতিহাদ স্টেডিয়ামে ট্রফি জয়ের দীর্ঘ অধ্যায় শেষে পেপ গার্দিওলা পদত্যাগ করলে ম্যানচেস্টার সিটি কোচ হিসেবে বেছে নিয়েছে এনজো মারেস্কাকে।
লিয়াম রোসেনিয়রের ব্যর্থ অধ্যায় শেষে চেলসি কোচ হিসেবে নিয়োগ দিয়েছে জাবি আলোনসোকে। আন্দোনি ইরাওলার চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ায় বোর্নমাউথ কোচ হিসেবে নিয়ে এসেছে মার্কো রোজকে। এছাড়া ভিতোর পেরেইরাকে বরখাস্ত করার পর নটিংহ্যাম ফরেস্ট কোচ করেছে অলিভার গ্লাজনারকে।
অন্যদিকে, গ্লাজনারের চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ার পর ক্রিস্টাল প্যালেস কোচ হিসেবে নিয়োগ দিয়েছে পিয়েরে সেজকে। মার্কো সিলভার চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ার পর ফুলহ্যাম নিয়ে এসেছে আলভারো আরবেলোয়াকে। কিয়েরান ম্যাককেনার পদত্যাগের পর ইপসউইচ টাউন গ্যারি ও’নিলকে কোচ হিসেবে নিযুক্ত করেছে।
এডি হাউ দায়িত্ব ছাড়ার পর নিউক্যাসল ইউনাইটেড ম্যাথিয়াস জেইসলেকে নিয়োগ দেবে বলে আশা করা হচ্ছে। সব মিলিয়ে নয়টি ক্লাব নতুন স্থায়ী কোচ নিয়ে মৌসুম শুরু করবে। এর আগের রেকর্ডটি ছিল ২০১৬-১৭ মৌসুমে, যখন আটটি ক্লাব নতুন কোচ নিয়ে মাঠে নেমেছিল। সেই মৌসুমে গার্দিওলার ম্যানচেস্টার সিটিতে আগমন এবং চেলসিতে আন্তোনিও কন্তের নিয়োগ হয়েছিল, যেখানে কন্তে তার প্রথম মৌসুমেই শিরোপা জিতেছিলেন। এর আগে ১৯৯৫-৯৬ মৌসুমের শুরুতে সাতটি ক্লাব এবং ২০১২-১৩ মৌসুমে ছয়টি ক্লাব তাদের কোচ পরিবর্তন করেছিল।
বদলে যাচ্ছে নেতৃত্বের ধারা
২০১৯ সালের ডিসেম্বরে নিয়োগ পাওয়া আর্সেনালের মিকেল আর্তেতা এখন লিগের সবচেয়ে দীর্ঘ সময় ধরে দায়িত্ব পালনকারী কোচ। অথচ সাত বছরেরও কম সময় ধরে তিনি এই পদে আছেন। ইউরোপের শীর্ষ পাঁচটি লিগের মধ্যে একমাত্র আতলেতিকো মাদ্রিদের দিয়েগো সিমিওনেই কেবল দীর্ঘ সময় ধরে ক্লাবের দায়িত্ব পালন করছেন, যিনি ২০১১ সালের ডিসেম্বর থেকে সেখানে রয়েছেন।
অ্যাস্টন ভিলার উনাই এমেরি এবং লিডস ইউনাইটেডের ড্যানিয়েল ফার্কে তাদের বর্তমান ক্লাবে তিন বছরের বেশি সময় ধরে আছেন। আর ২০২৪ সালের জুলাইয়ে নিয়োগ পাওয়া সান্ডারল্যান্ড কোচ রেগিস লে ব্রিস এখন এই বিভাগে চতুর্থ দীর্ঘস্থায়ী কোচের তালিকায় রয়েছেন।
ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড কোচ মাইকেল ক্যারিক দেখিয়েছেন যে পরিস্থিতি কতটা দ্রুত পরিবর্তন হয়। জানুয়ারিতে অন্তর্বর্তীকালীন দায়িত্ব নেওয়ার পর মে মাসে তিনি স্থায়ী কোচ হন। তবুও প্রিমিয়ার লিগের মাত্র ১০ জন কোচ তার চেয়ে বেশি সময় ধরে দায়িত্বে আছেন। ২০১৩ সালে স্যার অ্যালেক্স ফার্গুসন অবসর নেওয়ার পর ক্যারিক ইউনাইটেডের সপ্তম স্থায়ী কোচ। মার্চ মাসে নিয়োগ পাওয়া টটেনহ্যাম হটস্পারের রবার্তো ডি জেরবি তার চেয়ে মাত্র এক ধাপ পিছিয়ে আছেন।
‘নতুন কোচের প্রভাব’ কি টিকে থাকবে?
এই মৌসুমের আরেকটি বড় প্রশ্ন হলো, ঐতিহ্যগতভাবে ‘নতুন কোচ আসার পর সাফল্যের জোয়ার’ (New Manager Bounce) কি এবারও দেখা যাবে? এই তত্ত্ব অনুযায়ী, নতুন কোচ নিয়োগের পর খেলোয়াড়দের মধ্যে বাড়তি উদ্দীপনা এবং কৌশলী পরিবর্তনের কারণে দলগুলো সাময়িকভাবে ভালো ফল করে।
এই মৌসুমে বিষয়টি পরীক্ষার মুখে পড়বে। প্রথম ম্যাচউইকেই নতুন কোচদের লড়াই দেখা যাবে তিনটি ম্যাচে—ফুলহ্যাম বনাম চেলসি, ম্যানচেস্টার সিটি বনাম বোর্নমাউথ এবং লিভারপুল বনাম নিউক্যাসল। প্রতিটি দলই নতুন কৌশল ও কোচিং পদ্ধতির সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করবে। লিভারপুলের শুরুর দিকটা বেশ চ্যালেঞ্জিং। ইরাওলার প্রথম ছয়টি প্রিমিয়ার লিগ ম্যাচই হবে নতুন স্থায়ী কোচদের অধীনে থাকা দলগুলোর বিপক্ষে। নিউক্যাসলের পর তারা ফরেস্ট, ইপসউইচ, ফুলহ্যাম, বোর্নমাউথ এবং ম্যানচেস্টার সিটির মুখোমুখি হবে।
কে সংজ্ঞায়িত করবে আগামী প্রিমিয়ার লিগ যুগ?
১৯৮৫-৮৬ মৌসুমের পর প্রথমবারের মতো ইংল্যান্ডের শীর্ষ লিগ শুরু হচ্ছে স্যার অ্যালেক্স ফার্গুসন, আর্সেন ওয়েঙ্গার, হোসে মরিনহো, ইয়ুর্গেন ক্লপ বা গার্দিওলাকে ছাড়াই। তারা প্রত্যেকেই প্রিমিয়ার লিগের ৩৪টি শিরোপার মধ্যে ২৬টি জিতেছেন।
ফার্গুসনের দল প্রিমিয়ার লিগের শুরুর দিকে মানদণ্ড স্থাপন করেছিল। ওয়েঙ্গার আর্সেনালে খেলোয়াড়দের প্রস্তুতি, স্পোর্টস সায়েন্স এবং পুষ্টির ধারণা বদলে দিয়েছিলেন। মরিনহো কৌশলী খেলার নতুন মাত্রা যোগ করেন, ক্লপ লিভারপুলে হাই-ইনটেনসিটি প্রেসিং ফুটবল চালু করেন এবং গার্দিওলার পজিশনাল ফুটবল ম্যানচেস্টার সিটিকে শক্তিশালী দল হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে।
গত মৌসুমে গানারদের শিরোপা জেতানো আর্তেতার সামনে সুযোগ আছে প্রিমিয়ার লিগ শিরোপা ধরে রাখার। তবে তার প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বীরা নতুন কোচ নিয়ে মাঠে নামছেন এবং ক্যারিক রেড ডেভিলদের কোচ হিসেবে প্রথম পূর্ণ মৌসুম শুরু করছেন। তবে তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে প্রিমিয়ার লিগের ইতিহাস গড়ে আসা কোচদের প্রস্থানের পর ২০২৬-২৭ মৌসুম একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা করছে।
কোচ পরিবর্তন কি সাফল্যের নিশ্চয়তা দেয়?
বিগত মৌসুমেও প্রিমিয়ার লিগে কোচ পরিবর্তনের হিড়িক ছিল। ২০২৫-২৬ মৌসুমে ১১টি কোচ পরিবর্তনের ঘটনা ঘটেছিল। এখন একজন কোচের গড়ে দায়িত্ব পালনের সময়কাল প্রায় ২০ মাস। এটিই প্রমাণ করে যে ফুটবলের এই চাকরি কতটা অনিশ্চিত।
সাম্প্রতিক ইতিহাস বলছে, কোচ পরিবর্তন সাফল্যের নিশ্চয়তা দেয় না। ২০২৫-২৬ মৌসুমে বেশ কয়েকটি ক্লাব কোচ বদল করেও ব্যর্থ হয়েছিল। তবে কেউ কেউ তাৎক্ষণিক সাফল্যও পেয়েছে। ক্যারিক ইউনাইটেড কোচ হিসেবে প্রথম পাঁচ ম্যাচে গড়ে ২.৬ পয়েন্ট করে পেয়েছিলেন। চেলসির দায়িত্ব নেওয়ার পর রোসেনিয়রও একই পয়েন্ট পেয়েছিলেন। তবে রোসেনিয়রের মেয়াদ শেষ পর্যন্ত দীর্ঘ হয়নি; বরখাস্ত হওয়ার আগে শেষ আট ম্যাচের মাত্র একটিতে জয় পেয়েছিল তার দল।
ফাইন্যান্সিয়াল টাইমসের গবেষণা এবং সাইমন কুপার ও স্টিফান জিম্যানস্কির ‘সকারনমিকস’ বইয়ের তথ্য অনুযায়ী, কেবল কোচ পরিবর্তন নয়, খেলোয়াড়দের মান এবং ক্লাবের ব্যয় করার ক্ষমতা ফলাফলের ক্ষেত্রে বড় ভূমিকা রাখে। স্পোর্টস কনসালটেন্সি ‘টোয়েন্টি ফার্স্ট গ্রুপ’ বলছে, কোচরা নিজেদের যোগ্যতার পাশাপাশি তাদের জন্য নির্ধারিত পরিবেশ অনুযায়ী সফল বা ব্যর্থ হন।
১৯৯২ সালে প্রিমিয়ার লিগ শুরুর পর মাত্র ছয়জন কোচ তাদের প্রথম মৌসুমেই শিরোপা জিতেছেন। ২০০৪-০৫ মৌসুমে মরিনহো চেলসির হয়ে, ২০০৯-১০ মৌসুমে কার্লো আনচেলত্তি একই ক্লাবের হয়ে, ২০১৩-১৪ মৌসুমে ম্যানুয়েল পেল্লেগ্রিনি ম্যানচেস্টার সিটির হয়ে, ২০১৫-১৬ মৌসুমে ক্লদিও রানিয়েরি লিস্টার সিটির হয়ে, ২০১৬-১৭ মৌসুমে কন্তে চেলসির হয়ে এবং সবশেষে ২০২৫-২৬ মৌসুমে স্লট লিভারপুলের হয়ে প্রথম মৌসুমে চ্যাম্পিয়ন হন। প্রিমিয়ার লিগের অর্ধেক ক্লাব নতুন নেতৃত্বে শুরু করায় এটি নিশ্চিতভাবেই অন্যতম অনিশ্চিত এক মৌসুম হতে যাচ্ছে।
