২০২৬ বিশ্বকাপ ফাইনাল: মাঠের চেয়ে মাঠের বাইরের ঘটনাতেই আলোচনায় আসর
২০২৬ বিশ্বকাপের ফাইনাল ম্যাচটি ফুটবলীয় নৈপুণ্যের জন্য হয়তো খুব একটা স্মরণীয় হয়ে থাকবে না, তবে মাঠের বাইরের ঘটনাবলির জন্য এটি ইতিহাসে জায়গা করে নিয়েছে।
ফাইনালে ইতিহাসের দীর্ঘতম হাফ-টাইমের দেখা মেলে। বিরতির সময় ম্যাডোনা এবং জাস্টিন বিবারের মতো শিল্পীদের পরিবেশনা ছিল। কিক-অফের আগে হলিউডের তারকা টম ক্রুজ বক্তব্য রাখেন। এছাড়া মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের উপস্থিতি এবং দিনের আলোয় প্রচুর আতশবাজির ঝলকানি ছিল চোখে পড়ার মতো।
অতিরিক্ত সময়ে ফেরান তোরেসের করা একমাত্র গোলে আর্জেন্টিনাকে হারিয়ে স্পেন দ্বিতীয়বারের মতো শিরোপা জয় করে। তবে খেলার মাঠের চেয়ে অন্যান্য বিষয়গুলোই ছিল আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে।
ট্রাম্প ও বিশ্বকাপ ট্রফি
যুক্তরাষ্ট্র, মেক্সিকো এবং কানাডার যৌথ আয়োজনে অনুষ্ঠিত এই বিশ্বকাপে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের দিকেই নজর ছিল বেশি। বিশেষ করে ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিভিন্ন মন্তব্য ও কর্মকাণ্ড নিয়ে অনেক বিতর্ক হয়েছে।
এর আগে ট্রাম্প দাবি করেছিলেন যে এবারের বিশ্বকাপ অন্য সব বিশ্বকাপের চেয়ে আলাদা। আর এই মন্তব্যের যথার্থতা মিলেছে নানা ঘটনায়। এর মধ্যে অন্যতম হলো যুক্তরাষ্ট্রের স্ট্রাইকার ফোলারিন বালোগুনকে লাল কার্ড দেখানো সত্ত্বেও তার ওপর নিষেধাজ্ঞা না আসার বিতর্ক।
ট্রাম্প নিজেই স্বীকার করেছেন যে, তিনি ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনোর সঙ্গে কথা বলে লাল কার্ডের বিষয়টি পুনর্বিবেচনা করতে বলেছিলেন। এই নিষেধাজ্ঞার খড়গ না থাকায় বেলজিয়ামের বিপক্ষে শেষ ষোলোর ম্যাচে বালোগুন খেলতে পেরেছিলেন।
টুর্নামেন্টে ট্রাম্পের অনুপস্থিতিও ছিল বিস্ময়কর। ফাইনালের আগে তিনি কোনো ম্যাচ দেখতে যাননি। তাই রবিবার নিউ ইয়র্ক নিউ জার্সি স্টেডিয়ামে তার আগমনের দিকে সবার চোখ ছিল। তিনটি হেলিকপ্টার স্টেডিয়ামের ওপর দিয়ে চক্কর দেওয়ার পর ল্যান্ড করে। কিক-অফের ২০ মিনিট আগে তিনি স্টেডিয়ামে পৌঁছান এবং জিয়ান্নি ইনফান্তিনোর পাশে বসে রবি উইলিয়ামস ও নিকোল শেরজিঞ্জারের সমাপনী অনুষ্ঠানের পরিবেশনা উপভোগ করেন। প্রথমার্ধের খেলায় তাকে ট্রফিটির দিকে তাকাতেও দেখা যায়।
ইতিহাসের দীর্ঘতম হাফ-টাইম
ট্রাম্পের উপস্থিতির পাশাপাশি ফাইনালের আগে সবচেয়ে বড় আলোচনার বিষয় ছিল সুপার বোল স্টাইলের হাফ-টাইম শো। সাধারণত প্রথমার্ধের পর খেলোয়াড়দের বিশ্রাম এবং কোচদের পরিকল্পনার জন্য বিরতি দেওয়া হয়। কিন্তু এবার সেই বিরতিকে মিনি-কনসার্টে রূপান্তর করা হয়েছে।
এই আয়োজনে ম্যাডোনা, বিটিএস, কোল্ডপ্লে এবং শাকিরা অংশগ্রহণ করেন। বিশ্বকাপের আনুষ্ঠানিক গান ‘দাই দাই’ গেয়েছেন শাকিরা। এছাড়া জাস্টিন বিবারকেও মঞ্চে দেখা গেছে। টেড লাসোর পেপ টকের পর বিবার তার পরিবেশনায় কিছুটা ভিন্নতা আনেন।
এই বিরতি স্থায়ী হয় ২৭ মিনিট। তবে ভক্তদের মধ্যে এই শো নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। ম্যাচ অব দ্য ডে স্টুডিওতে প্রখ্যাত ইংলিশ স্ট্রাইকার ওয়েইন রুনি কিছুটা কঠোরভাবেই বলেন, “আমার মনে হয়েছে এটি বাজে ছিল। পরিবেশনাগুলো ভালো ছিল না। সময়জ্ঞানও ঠিক ছিল না। আমাদের শুধু ফুটবল খেলতে দিন।”
ম্যাচের আগে সমাপনী অনুষ্ঠানেও অনেকটা একই ধরনের আয়োজন ছিল, যেখানে উচ্চ শব্দে গান ও মাঠজুড়ে নাচের পাশাপাশি অভিনেতা টম ক্রুজের নাটকীয় বক্তব্য শোনা যায়।
ট্রফি বিতরণ পর্বে ট্রাম্প
নিরপেক্ষ দর্শকদের আগ্রহ ছিল, ট্রফি দেওয়ার সময় ট্রাম্প কতটা দৃশ্যমান থাকেন তা নিয়ে। গত বছর ক্লাব বিশ্বকাপ ফাইনালে অধিনায়ক রিস জেমসকে ট্রফি দেওয়ার পর ট্রাম্প মাঠেই রয়ে গিয়েছিলেন। জেমস জানিয়েছিলেন, তাকে মঞ্চ থেকে চলে যেতে বলা হলেও তিনি সেখানে অবস্থান করেছিলেন।
রবিবার বিশ্বকাপ ফাইনালে ট্রাম্প এবং ইনফান্তিনো বিজয়ীদের পদক পরিয়ে দেওয়ার সময় ট্রাম্প সেখানে কিছুক্ষণ ছিলেন, তবে ক্লাব বিশ্বকাপের মতো অতটা দীর্ঘ সময় নয়। ট্রাম্প ও ইনফান্তিনো যখন ট্রফি দেওয়ার জন্য মাঠে আসেন, তখন স্টেডিয়ামের অনেক দর্শক দুয়ো দেন। এমনকি পদক নেওয়ার সময় আর্জেন্টিনার ডিফেন্ডার ক্রিস্টিয়ান রোমেরো ইনফান্তিনোর কাছ থেকে মেডেল নিলেও ট্রাম্পের সঙ্গে হ্যান্ডশেক করা এড়িয়ে সরাসরি চলে যান।
কিক-অফের আগে দীর্ঘ লাইন ও কড়াকড়ি নিরাপত্তা
এই বিশ্বকাপ ফাইনালটি ছিল অত্যন্ত জাঁকজমকপূর্ণ, তবে মাঠের ভেতরের গ্ল্যামারের চেয়ে মাঠের বাইরে দর্শকদের দীর্ঘ লাইন ও কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা ছিল বেশ কষ্টকর। ট্রাম্পের উপস্থিতির কারণে যুক্তরাষ্ট্রের সিক্রেট সার্ভিস নিরাপত্তার দায়িত্ব নিজেদের হাতে নিয়েছিল।
স্থানীয় সময় বেলা ১১টায় সাধারণ দর্শকদের জন্য গেট খুলে দেওয়া হয়। কিন্তু সাংবাদিক, খেলোয়াড় ও স্টাফরা অনেক আগে থেকেই সেখানে পৌঁছাতে শুরু করেন। গেট নিয়ে বিভ্রান্তির কারণে অনেক সাংবাদিককে এক প্রবেশপথ থেকে ফিরে গিয়ে অন্য দীর্ঘ লাইনে দাঁড়াতে হয়েছে। এছাড়া প্রতিটি গেটে ব্যাগ তল্লাশি আগের চেয়ে অনেক বেশি কঠোর ছিল। তবে সব বাধা পেরিয়ে শেষ পর্যন্ত ম্যাচটি নির্ধারিত সময়েই শুরু হয়।
