সেমিফাইনালে হার: কৌশলগত ভুলে স্বপ্নভঙ্গ ইংল্যান্ডের
আটলান্টায় খেলা শেষ হওয়ার বাঁশি বাজার পর দেখা গেল এক হৃদয়বিদারক দৃশ্য। ইংল্যান্ডের খেলোয়াড়রা মাঠের বিভিন্ন প্রান্তে স্তব্ধ হয়ে পড়ে আছেন। তারা এমন একটি ম্যাচ হেরে বসেছেন, যা তাদের ৬০ বছরের মধ্যে প্রথমবার বিশ্বকাপ ফাইনালে নিয়ে যেতে পারত। ম্যাচটি জয়ের খুব কাছে পৌঁছেও শেষ পর্যন্ত তা হাতছাড়া হলো।
এই হারের গভীরতা টের পাওয়ার পর দেখা যায় জুড বেলিংহামকে। তিনি মাঠের মাঝখানে পাথরের মতো দাঁড়িয়ে ছিলেন। দলের অন্য খেলোয়াড়রা কেউ হাঁটু গেড়ে বসে পড়েছেন, কেউবা শুয়ে পড়েছেন। আর্জেন্টিনা যে জয় নিয়ে মাঠ ছাড়ল, তা যেন তাদের নিয়তি ছিল।
তবে ইংল্যান্ডের কাছে ২-১ ব্যবধানের এই পরাজয় ভাগ্যের কোনো লিখন ছিল না, ছিল সম্পূর্ণ কৌশলগত ব্যর্থতা। ইংল্যান্ডের কোচ টমাস টুখেল পুরো বিশ্বকাপজুড়েই সাহসী ফুটবলের কথা বলেছেন। কিন্তু সেমিফাইনালে এসে সেই টুখেলের কৌশলই তাদের কাল হলো।
হারের পর টুখেল বলেন, ‘আমি মনে করি এটিই খেলার নিয়ম। যখনই আপনি হারবেন, তখনই সমালোচনা শুনতে হবে। আমরা যদি ভিন্ন কোনো সিদ্ধান্ত নিতাম তবে কী হতো, তা কেউ জানে না। তাই এসব নিয়ে মাথা ঘামিয়ে লাভ নেই।’
৫২ বছর বয়সী এই জার্মান কোচের ওপর দায়িত্ব ছিল ইংল্যান্ডের খেলার মান নিয়ন্ত্রণ এবং খেলোয়াড়দের দায়বদ্ধতা নিশ্চিত করা। সম্ভবত ১-০ গোলের লিড ধরে রাখতে তিনি চেয়েছিলেন খেলোয়াড়রা শক্তি বাঁচিয়ে খেলুক। আর্জেন্টিনার প্রত্যাবর্তনের ক্ষমতাকে অতিরিক্ত সমীহ করতে গিয়ে তিনি হয়তো নিজের দলেরই ক্ষতি করে ফেলেছেন।
খেলার শেষ ২০ মিনিট টুখেল রক্ষণাত্মক কৌশল অবলম্বন করেন। তিনি গোলপোস্টের সামনে অতিরিক্ত ডিফেন্ডার নামিয়ে দেন এবং গোল করার সব আশা প্রায় ছেড়েই দেন। কোচ চেয়েছিলেন ১-০ ব্যবধানে ম্যাচটি জিততে, কিন্তু তার সেই কৌশলের ফল তাদের জন্য শুভ হলো না।
টুখেল বলেন, ‘আর্জেন্টিনা ঝুঁকি নিয়ে খেলেছে। বিপরীতে আমরা রক্ষণাত্মক হয়ে পড়েছিলাম। আমরা বল দখলের লড়াইয়ে পিছিয়ে পড়ি এবং প্রতিপক্ষের আক্রমণের চাপ সামলাতে হিমশিম খাই। ফলে তারা ম্যাচটি জিতে নেয়।’
ম্যাচ শুরুর আগে টুখেল বলেছিলেন, টুর্নামেন্টের এই পর্যায়ে দলকে সাহসী হতে হবে এবং আক্রমণাত্মক ফুটবল খেলতে হবে। কিন্তু খেলা চলাকালে তিনি কি তার সেই কথা ভুলে গিয়েছিলেন? নাকি শেষ মুহূর্তে এসে তিনি চাপে পড়েছিলেন?
বুধবারের এই ম্যাচের আগে ইংল্যান্ডের যাত্রা ছিল বেশ ক্লান্তিকর। আটলান্টা থেকে মেক্সিকো সিটি এবং পরে মায়ামির তীব্র গরমের মধ্যে নরওয়ের বিপক্ষে কঠিন লড়াইয়ের পর আর্জেন্টিনা ও লিওনেল মেসির মুখোমুখি হওয়াটা তাদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ ছিল। কিন্তু ১-০ গোলে এগিয়ে থাকার পরও শেষ ২০ মিনিট যেভাবে ইংল্যান্ড রক্ষণাত্মক হয়ে পড়েছিল, তা ছিল বিপর্যয়ের মূল কারণ।
ইংল্যান্ডের স্ট্রাইকার হ্যারি কেন বলেন, ‘আমরা লিড ধরে রাখার চেষ্টা করছিলাম। কিন্তু ২০ মিনিট ও ইনজুরি টাইম অনেক লম্বা সময়। আমরা বল ধরে রাখতে এবং চাপ সৃষ্টি করতে ব্যর্থ হয়েছি।’
১৯৯৬ সাল থেকে ইংল্যান্ড নকআউট পর্বে আটবার ১-০ গোলের লিড নিয়েও ম্যাচ হেরেছে। এই ব্যর্থতা কাটানোর জন্যই টুখেলকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল। নরওয়ের বিপক্ষে জয়ের পর টুখেল দলের পারফরম্যান্স নিয়ে বিরক্তি প্রকাশ করেছিলেন, যা বেলিংহামসহ অনেকের মনে অসন্তোষ সৃষ্টি করেছিল।
অবশ্য হারের দায় শুধু কোচকে দিলে চলবে না। ডিফেন্ডার ড্যান বার্ন বলেন, ‘দায়বদ্ধতা খেলোয়াড়দেরও আছে। ফুটবলের এই পর্যায়ে সূক্ষ্ম ব্যবধানই পার্থক্য গড়ে দেয়।’
টুখেল অবশ্য এসব ‘কী হতো’র আলোচনায় যেতে নারাজ। তিনি বলেন, ‘আমি কোনো অভিশাপ বা ইতিহাসের পুনরাবৃত্তিতে বিশ্বাস করি না। ফুটবলের কারণেই আমরা হেরেছি, কারণ আমরা সঠিক কাঠামোতে যথেষ্ট সক্রিয় ছিলাম না।’
