ফুটবল বিশ্বে যে বড় দলবদলগুলো শেষ পর্যন্ত হয়নি
ফুটবল প্রেমীরা নতুন ট্রান্সফার উইন্ডো আসার অপেক্ষায় অধীর আগ্রহে থাকেন। সমর্থকদের মনে নতুন স্বপ্ন জাগে—যদি কোনো বড় তারকা ক্লাবে যোগ দেন, তবে হয়তো তাদের প্রিয় দল বড় কোনো সাফল্য পাবে। টটেনহ্যাম হটস্পারের ভক্তদের মধ্যেও কয়েক বছর আগে এমন উত্তেজনা দেখা গিয়েছিল, যখন নাইজেরিয়ার তরুণ স্ট্রাইকার গিফট ওরবানের সঙ্গে ক্লাবটির নাম জড়িয়েছিল।
২০২৩ সালের গ্রীষ্মে ২১ বছর বয়সী ওরবানকে ফুটবলের অন্যতম উজ্জ্বল প্রতিভাবান খেলোয়াড় হিসেবে গণ্য করা হতো। নরওয়ের শীর্ষ লিগের দল স্ট্যাবেকের হয়ে ২২ ম্যাচে ১৬ গোল করার পর তিনি বেলজিয়ামের ক্লাব গেন্টে যোগ দেন এবং সেখানেও গোল করার ধারা অব্যাহত রাখেন। তিনি সেখানে ২২ ম্যাচে ২০ গোল করেন। ২০২৩ সালের মার্চ মাসে মাত্র চার দিনের ব্যবধানে তিনি দুটি ম্যাচে সাত গোল করেছিলেন। জুলতে ওরেগেমের বিপক্ষে ৬-২ ব্যবধানে জয়ের ম্যাচে তিনি চার গোল করেন, যা একবিংশ শতাব্দীতে গেন্টের কোনো খেলোয়াড়ের জন্য প্রথম নজির। এরপর কনফারেন্স লিগের শেষ ষোলোতে ইস্তাম্বুল বাসাকসেহিরের বিপক্ষে তিনি দ্রুততম হ্যাটট্রিক করেন। মাত্র ৩ মিনিট ২৫ সেকেন্ডে করা এই হ্যাটট্রিকটি তখন উয়েফা ক্লাব প্রতিযোগিতায় রেকর্ড ছিল।
ইংল্যান্ডের অধিনায়ক হ্যারি কেন বায়ার্ন মিউনিখে যোগ দেওয়ার পর টটেনহ্যামের একজন স্ট্রাইকার প্রয়োজন ছিল। বিবিসি গসিপ কলামে গিফট ওরবানকে হ্যারি কেনের বিকল্প হিসেবে তুলে ধরা হয়। এমনকি ‘ওরবান কি বিশ্ব তারকা হতে পারেন?’ এমন শিরোনামে সংবাদও প্রকাশিত হয়েছিল। তবে টটেনহ্যামের নতুন কোচ অ্যাঞ্জে পোস্তেকোগলুর অধীনে ক্লাবটি ২৫ মিলিয়ন পাউন্ডের ফি নিয়ে দ্বিধায় পড়ে যায় এবং দলবদলটি সম্পন্ন হয়নি। গত তিন বছরে ওরবান চারটি ক্লাবে খেলেছেন। গত সপ্তাহে তিনি তুর্কি ক্লাব আমেদস্পোরে ধারের চুক্তিতে যোগ দিয়েছেন। গেন্ট, ফরাসি ক্লাব লিওন এবং বুন্দেসলিগার দল হফেনহাইমে তিনি খুব একটা ভালো ফর্মে ছিলেন না, যদিও গত মৌসুমে ইতালির ক্লাব ভেরোনায় ধারের চুক্তিতে খেলার সময় তিনি সাতটি গোল করেছিলেন।
ফুটবল ইতিহাসে অবশ্য এমন অনেক দলবদল ব্যর্থ হওয়ার ঘটনা রয়েছে, যেগুলোর ফলাফল অন্যরকম হতে পারতো।
২০০৯ সালের জানুয়ারিতে ম্যানচেস্টার সিটি ব্রাজিলের প্লে-মেকার কাকার দিকে নজর দিয়েছিল। সে সময় ম্যান সিটির বিশাল অঙ্কের ১০৮ মিলিয়ন পাউন্ডের প্রস্তাব কাকা এবং এসি মিলান—উভয়কেই নাড়িয়ে দিয়েছিল। একজন সিটি সমর্থক এতটাই নিশ্চিত ছিলেন যে, তিনি কাকার নাম নিজের বুকে ট্যাটুও করিয়েছিলেন। তবে ২০০৭ সালের ব্যালন ডি’অর জয়ী এই তারকা শেষ পর্যন্ত ম্যানচেস্টারে যেতে রাজি হননি। যদিও সেই বছরের শেষের দিকে ৫৬ মিলিয়ন পাউন্ডের বিশ্ব রেকর্ড মূল্যে তিনি রিয়াল মাদ্রিদে যোগ দিয়েছিলেন। রিয়াল মাদ্রিদে তিনি স্প্যানিশ কাপ এবং লা লিগা জয় করেন, এরপর এসি মিলান ও মেজর লিগ সকারে অরল্যান্ডো সিটির হয়ে খেলার পর সাও পাওলোতে ক্যারিয়ার শেষ করেন।
২০০৪ সালে বোল্টন ওয়ান্ডারার্স ইউরোপিয়ান ফুটবলে খেলার স্বপ্ন দেখছিল। ম্যানেজার স্যাম অ্যালারডাইস এসি মিলানে সুযোগ না পাওয়া ব্রাজিলের বিশ্বকাপ জয়ী তারকা রিভালদোকে দলে ভেড়ানোর চেষ্টা করেন। রিভালদো নিজেও জানিয়েছিলেন, তিনি বোল্টনকে ইউরোপের মঞ্চে নিয়ে যাওয়ার চ্যালেঞ্জ নিতে আগ্রহী। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সিদ্ধান্ত বদলে তিনি গ্রিসের ক্লাব অলিম্পিয়াকোসে যোগ দেন। সে মৌসুমে বোল্টন লিগে ষষ্ঠ স্থানে থেকে উয়েফা কাপের যোগ্যতা অর্জন করেছিল।
১৯৯৫ সালে প্রিমিয়ার লিগ জেতার পর ব্ল্যাকবার্ন রোভারস ফরাসি মিডফিল্ডার জিনেদিন জিদানকে সই করার সুযোগ পেয়েছিল। ক্লাব ম্যানেজমেন্ট জিদান এবং ক্রিস্তোফ দুগারিকে কেনার পরামর্শ দিলেও মালিক জ্যাক ওয়াকার বলেছিলেন, “আমাদের দলে টিম শেরউড থাকতে জিদান কেন দরকার?” শেষ পর্যন্ত চুক্তি সম্পন্ন হয়নি। জিদান পরবর্তীতে ফ্রান্সের হয়ে বিশ্বকাপ এবং ইউরো জয় করেন, সেইসাথে জুভেন্টাস ও রিয়াল মাদ্রিদের হয়ে অসংখ্য শিরোপা জেতেন।
২০০৫ সালে লিভারপুল চ্যাম্পিয়নস লিগ জেতার পর স্টিভেন জেরার্ড দল ছাড়ার আবেদন করেছিলেন। চেলসি কোচ হোসে মরিনহো তাকে ৩২ মিলিয়ন পাউন্ডের বিনিময়ে দলে পেতে আগ্রহী ছিলেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত পারিবারিক কারণে জেরার্ড লিভারপুলেই থেকে যান। দশ বছর পর মরিনহো জানিয়েছিলেন, জেরার্ডকে সই করাতে না পারা তার জীবনের অন্যতম বড় আক্ষেপ।
২০১৭ সালে মোনাকোতে থাকাকালীন কিলিয়ান এমবাপ্পের সঙ্গে লিভারপুলের কথাবার্তা হয়েছিল। এমবাপ্পে জানিয়েছিলেন, তার মা লিভারপুল পছন্দ করেন। লিভারপুলের তৎকালীন কোচ ইয়ুর্গেন ক্লপ ব্যক্তিগত বিমানে করে এমবাপ্পের পরিবারের সঙ্গে সাক্ষাৎও করেছিলেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তিনি পিএসজিতে যোগ দেন এবং পরবর্তীতে ২০২৪ সালে রিয়াল মাদ্রিদে নাম লেখান।
২০১৪ সালের জানুয়ারিতে ফুলহ্যাম তাদের টিকে থাকার লড়াইয়ের জন্য রিয়াল সোসিয়েদাদের আন্তোয়ান গ্রিজমানকে কেনার জন্য ১২ মিলিয়ন পাউন্ডের প্রস্তাব দিয়েছিল। কিন্তু সেই অর্থ দিয়ে তারা কোস্টাস মিত্রোগলুকে দলে নেয়, যিনি প্রিমিয়ার লিগে কোনো গোলই করতে পারেননি এবং ফুলহ্যাম অবনমিত হয়। গ্রিজমান পরবর্তীতে অ্যাটলেটিকো মাদ্রিদ ও বার্সেলোনায় সফল ক্যারিয়ার অতিবাহিত করেন।
