নারী সুপার লিগে ধুঁকছে আর্সেনাল, চাপে রেনি স্লেগার্স
এমিরেটসের মাঠে ম্যাচ শেষে আর্সেনাল স্কোয়াডের যে দৃশ্য দেখা গেল, তা একতাবদ্ধ বা সুশৃঙ্খল কোনো দলের প্রতিচ্ছবি নয়, বরং তাদের মধ্যে এক ধরনের বিহ্বলতা স্পষ্ট ছিল। দলের অনেক সিনিয়র খেলোয়াড় একে অপরের চোখের দিকে তাকাতে পর্যন্ত অস্বস্তি বোধ করছিলেন। মৌসুমের বয়স দুই মাস পূর্ণ হওয়ার আগেই আর্সেনাল লিগ শিরোপার দৌড় থেকে প্রায় ছিটকে পড়েছে, যা এখন দলের জন্য এক তিক্ত বাস্তবতা। এই ব্যর্থতার চাপে এখন দলের প্রধান কোচ রেনি স্লেগার্স।
নারী সুপার লিগে (WSL) এটিই আর্সেনালের ইতিহাসে সবচেয়ে খারাপ শুরু। মৌসুমের শুরুর সপ্তাহে ব্রাইটনকে হারানোর পর টানা পাঁচ ম্যাচে জয়হীন তারা। লিগের ইতিহাসে এটি ক্লাবের দীর্ঘতম জয়হীন দৌড়। শনিবার নবাগত বার্মিংহামের সঙ্গে ১-১ গোলে ড্র করার পর এমিরেটসে দর্শকদের দুয়ো শুনতে হয়েছে আর্সেনালকে। এই ফলাফলের পর গানাররা পয়েন্ট টেবিলের অষ্টম স্থানে নেমে গেছে এবং শীর্ষস্থান দখল করা ম্যানচেস্টার সিটির চেয়ে তারা এখন ১২ পয়েন্ট পিছিয়ে।
গত আট বছরে আর্সেনাল একবারও শিরোপা জিততে পারেনি। ক্লাবের গৌরবময় ইতিহাস এবং ফুটবলের প্রসারে তাদের ভূমিকার তুলনায় এই পারফরম্যান্স একেবারেই বেমানান। গত দুই মৌসুমে তারা রানার্সআপ হলেও শিরোপার জন্য জোরালো লড়াই করতে ব্যর্থ হয়েছে। ঠিক দুই বছর আগে মৌসুমের মাত্র চার ম্যাচ পরই তৎকালীন প্রধান কোচ জোনাস এইডেভাল দায়িত্ব ছেড়ে দিয়েছিলেন। সেই সময়ও আর্সেনাল শীর্ষে থাকা ম্যানচেস্টার সিটির চেয়ে ৫ পয়েন্ট পিছিয়ে ছিল। সেই সময় যে সমস্যাগুলো—গোল করার অভাব, রক্ষণের দুর্বলতা এবং ধারাবাহিকতার অভাব—দেখা গিয়েছিল, এখনও সেই একই চিত্র ফুটে উঠছে।
চ্যাম্পিয়ন্স লিগ জয়ের মাত্র ১৮ মাসের মাথায় রেনি স্লেগার্স এখন বড় ধরনের চাপের মুখে। বার্সেলোনার মতো শক্তিশালী দলকে হারিয়ে চ্যাম্পিয়ন্স লিগ জেতানো এই কোচ এমিরেটসে দর্শকদের উপস্থিতির রেকর্ড গড়ার মতো মাঠের বাইরের কাজগুলোতে সফল হলেও, মাঠের খেলায় যেন থমকে গেছেন। তার কৌশল নিয়ে নতুন করে ভাবনার সময় এসেছে বলে মনে করছেন অনেকে।
চলতি মৌসুমে আর্সেনাল ১২১টি শট নিয়েও গোল পেয়েছে মাত্র পাঁচটি। তাদের নেওয়া শটগুলোর মাত্র ১৪ শতাংশ লক্ষ্যভেদ করতে পেরেছে। স্লেগার্সের দল রক্ষণাত্মক বা ‘লো-ব্লক’ কৌশলে খেলা দলগুলোর বিপক্ষেও হিমশিম খাচ্ছে। ক্রিস্টাল প্যালেস, ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড এবং বার্মিংহামের মতো দলগুলো এমিরেটসে এসে আর্সেনালের শক্তিশালী আক্রমণের মুখেও পয়েন্ট নিয়ে ফিরছে। আন্তর্জাতিক বিরতির পুরো সময় পাওয়ার পরও স্লেগার্স এবং তার কোচিং প্যানেল বার্মিংহামের রক্ষণ ভাঙার কোনো পথ খুঁজে পায়নি।
আর্সেনাল দুই বছর আগের সেই পুরোনো জায়গায় ফিরে যাওয়ায় ক্লাবের দলবদলের প্রক্রিয়া নিয়েও প্রশ্ন উঠছে। ডিরেক্টর অফ উইমেনস ফুটবল ক্লেয়ার হুইটলি এবং তার দল স্কোয়াডের গড় বয়স কমানোর দিকে নজর দিয়েছে। অলিভিয়া স্মিথ, স্মিলা হোলমবার্গ এবং লিসা বাউমের মতো তরুণীদের দলে নিলেও অভিজ্ঞ কেটি ম্যাককেব, বেথ মিড এবং লিয়া ওয়াল্টির মতো খেলোয়াড়দের বিদায়ে ভারসাম্য হারিয়েছে দল। গ্রীষ্মের দলবদলে জর্জিয়া স্ট্যানওয়ে, ওনা বাটল বা এলিস ডি আলমেডার মতো আন্তর্জাতিক খেলোয়াড়দের আনা হলেও, মাঠের খেলায় এর প্রতিফলন এখনো দেখা যায়নি।
দলে কিম লিটল, লেয়া উইলিয়ামসন, লটে ওবেন-ময়, স্টেফ ক্যাটলি এবং অ্যালেসিয়া রুশোর মতো নেতৃত্বস্থানীয় খেলোয়াড় থাকা সত্ত্বেও তাদের পারফরম্যান্সে এক ধরনের বিচ্ছিন্নতা স্পষ্ট। শনিবারের ড্রয়ের পর এই হতাশা আরও বেড়েছে। আগামী শনিবার টটেনহ্যামের বিপক্ষে নর্থ লন্ডন ডার্বিতে হারলে আর্সেনাল পয়েন্ট টেবিলে তাদের প্রতিবেশী দলটির চেয়েও সাত পয়েন্ট পিছিয়ে পড়বে। এমনটি ঘটলে তা কেবল বিব্রতকরই নয়, বরং লিগের শীর্ষ তিন দল ম্যানচেস্টার সিটি, চেলসি এবং লন্ডন সিটি লায়নেসেস থেকে তাদের দূরত্ব আরও বেড়ে যাবে।
চ্যাম্পিয়ন্স লিগ জয়ের পর যে আকাশচুম্বী প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল, আর্সেনাল এখন তার ধারেকাছেও নেই। রেনি স্লেগার্সের সামনে এখনো সুযোগ আছে এফএ কাপের ফাইনাল বা ইউরোপীয় প্রতিযোগিতায় ভালো করার মাধ্যমে মৌসুমটি বাঁচানোর। তবে নারী সুপার লিগে যেভাবে মূল্যবান পয়েন্ট নষ্ট হচ্ছে, তাতে বড় কিছু অর্জন করা এখন কঠিন বলেই মনে করছেন ফুটবল বিশ্লেষকরা।
