ব্যালন ডি’অর জয়ের লড়াইয়ে ফুটবলের নতুন সমীকরণ
গত বছর প্যারিসের ঐতিহাসিক থিয়েটার ডু শাটলে উসমান দেম্বেলে গোল্ডেন বল হাতে নেওয়ার পরপরই ২০২৬ সালের ব্যালন ডি’অর নিয়ে প্রচারণা শুরু হয়ে যায়। বিশ্বকাপ বছর হওয়ায় এই লড়াই এখন আর কেবল ব্যক্তিগত অর্জনে সীমাবদ্ধ নেই, বরং কোন খেলোয়াড় তার দেশকে গৌরব এনে দিতে পারেন, তা নিয়ে চলছে ব্যাপক আলোচনা।
বিবিসি স্পোর্টস ইউরো লিগস পডকাস্টে ইউরোপীয় ফুটবল বিশেষজ্ঞ গিলেম বালাগ বলেন, “ব্যালন ডি’অর নিয়ে প্রতিদিন আলোচনা হচ্ছে। এটি সমাজেরই প্রতিফলন, যেখানে ব্যক্তিগত অর্জনের ওপর অত্যধিক গুরুত্ব দেওয়া হয়। একটি দল কীভাবে কাজ করে তা বোঝার চেয়ে কেন একজন খেলোয়াড় ড্রিবল করছে বা করছে না, তা বোঝা অনেকের কাছে সহজ।”
অনুষ্ঠান যত ঘনিয়ে আসছে, আলোচনার পারদ ততই বাড়ছে। ফরাসি ফুটবল সাংবাদিক জুলিয়েন লরেন্সের মতে, কিছু ক্লাব এবং খেলোয়াড় তাদের পিআর মেশিন বা জনসংযোগের ওপর প্রচণ্ড নির্ভর করে। দলগুলোর কোচ ও পরিচালকরা নিজেদের খেলোয়াড়দের পক্ষে কথা বলছেন এবং কেন তাদের স্কোয়াডের অন্যরা ৩০ জনের সংক্ষিপ্ত তালিকায় নেই, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন।
বার্সেলোনার ডেকো রাফিনহা ও পেদ্রোর জায়গা না পাওয়াকে ‘বিশাল কেলেঙ্কারি’ বলে অভিহিত করেছেন। তবে তিনি লামিন ইয়ামালকে জয়ের ফেভারিট হিসেবে দেখছেন। ইয়ামাল নিজে অবশ্য কোনো কিছুর জন্য ভিক্ষা করবেন না বলে জানিয়েছেন। পিএসজি কোচ লুইস এনরিকে ব্যালন ডি’অর নিয়ে একঘেয়েমি প্রকাশ করলেও, তার দলের ১০ জন খেলোয়াড় সংক্ষিপ্ত তালিকায় রয়েছেন। উসমান দেম্বেলে এবং খিচা কভারাতসখেলিয়া একে অপরের প্রশংসা করেছেন। দেম্বেলে রসিকতা করে বলেন, “আমরা এটাকে দুই ভাগ করতে পারি। ওর মৌসুম অসাধারণ ছিল।” কভারাতসখেলিয়াও পাল্টা প্রশংসায় তাকেই যোগ্য মনে করেন।
জর্জিয়াতে ‘কভারা ডি’অর’ প্রচারণায় তাদের প্রিয় তারকার সাফল্য উদযাপন করা হয়েছে। অন্যদিকে, কিলিয়ান এমবাপ্পে প্রথমবার এই পুরস্কার জেতার আকাঙ্ক্ষা প্রকাশ করতে গিয়ে কিছুটা খোলামেলা ছিলেন। তিনি বলেন, “আমি সবসময় নিজেকে সেরা মনে করি, যদিও প্রত্যেকের নিজস্ব মতামত আছে। এই বছর ব্যালন ডি’অর জেতা আমার জন্য ভালো হতো, কিন্তু সাংবাদিকরাই ভোট দেবেন।”
২০১৫ সাল থেকে নিয়ম অনুযায়ী, ফ্রান্স ফুটবল এবং এল’ইকুইপের তৈরি ৩০ জনের সংক্ষিপ্ত তালিকায় ফিফা র্যাঙ্কিংয়ের শীর্ষ ১০০টি দেশের একজন করে সাংবাদিক ভোট দেন। এই ভোটিংয়ের সময়সীমা শেষ হয়ে গেছে এবং বিজয়ী ইতিমধ্যে নির্ধারিত।
স্পোর্টস ব্র্যান্ড স্ট্র্যাটেজিস্ট জেমস কার্কহামের মতে, এই পুরস্কারের প্রচারণা এখন অনেকটা নির্বাচনের মতো। প্রার্থীরা ভোট নিশ্চিত করতে দৌড়ঝাঁপ করেন। বায়ার্ন মিউনিখের ম্যাক্স এবারল হ্যারি কেন ও মাইকেল ওলিসের পক্ষে কথা বললেও মনে করেন, সেরা খেলোয়াড়দের প্রচারণার দরকার পড়ে না। ১৯৯১ সালের বিজয়ী জ্যঁ-পিয়েরে পাপিন অবশ্য এমবাপ্পের অতিমাত্রায় নিজেকে নিয়ে আলোচনার সমালোচনা করেছেন।
এমবাপ্পের মতে, ব্যালন ডি’অরের ধারণাটা লিওনেল মেসি ও ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোর যুগ থেকে এসেছে, যেখানে সাধারণ খেলোয়াড়দের বদলে অন্যদের চেয়ে আলাদা পারফর্ম করাদের এই পুরস্কার দেওয়া হয়। ২০০৭ সালে কাকার পর মেসি ও রোনালদো টানা ১৫ বছর এই পুরস্কার নিজেদের দখলে রেখেছিলেন। এসি মিলানের প্রাক্তন সিইও অরিদো ব্রাইদার মতে, বর্তমান বিশ্বে সব কিছু আলোর গতিতে চলে। এখনকার ভক্তরা ক্লাবের চেয়ে ব্যক্তিগত খেলোয়াড়দের বেশি অনুসরণ করেন।
সোসাল মিডিয়ার যুগে সব কিছু এখন অনেক বেশি শোরগোলপূর্ণ। সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল হওয়া একটি ক্লিপ বা মন্তব্য মুহূর্তেই বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে। মাইকেল ওয়েন স্মৃতিচারণ করে বলেন, ২০০১ সালে তিনি যখন ব্যালন ডি’অর জিতেছিলেন, তখন তিনি জানতেনই না এই পুরস্কারটি কী। তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এর বাণিজ্যিক গুরুত্ব বহুগুণ বেড়েছে।
এসি মিলানে কাকার উদাহরণ দিয়ে ব্রাইদা বলেন, ব্যালন ডি’অর জয়ী খেলোয়াড়দের বাজারমূল্য এবং বিশ্বজুড়ে জনপ্রিয়তা বিশাল হারে বেড়ে যায়। হ্যারি কেনের মতো খেলোয়াড়দের জন্য এটি একটি বিশাল প্রাপ্তি হবে। তবে রবার্ট লেভান্ডোভস্কি বা ফ্র্যাঙ্ক রিবেরির মতো খেলোয়াড়রা অতীতে এই পুরস্কার থেকে বঞ্চিত হয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। রিয়াল মাদ্রিদ ২০২৪ সালে ভিনিসিউস জুনিয়রের বদলে রদ্রি বিজয়ী হওয়ায় অনুষ্ঠান বয়কট করেছিল।
সবশেষে ব্রাইদা বলেন, “বর্তমানে এই পুরস্কার ক্লাবের জনপ্রিয়তা, দৃশ্যমানতা এবং আর্থিক দিক থেকে বড় প্রভাব ফেলে। সোশ্যাল মিডিয়ার এই যুগে তা আরও বেশি সত্য।” কার্কহামের মতে, এর ফলে সারা বিশ্বে আরও বেশি দর্শক যুক্ত হয় এবং অর্থ উপার্জনের পথ তৈরি হয়।
