জুড বেলিংহামের উত্থান: ইংল্যান্ডের জার্সিতে নতুন উচ্চতায় রিয়াল মাদ্রিদ তারকা
জুড বেলিংহামের দাপট এখন বিশ্বজুড়ে আলোচনার কেন্দ্রে। রিয়াল মাদ্রিদের এই মিডফিল্ডারের ফর্ম যেন ইংল্যান্ডের জার্সিতে আগের সব বড় টুর্নামেন্টের পারফরম্যান্সকেও ছাড়িয়ে যাচ্ছে। ইংল্যান্ডের বিশ্বকাপ দলে তার জায়গা পাওয়া নিয়ে একসময় যে সংশয় ছিল, তা এখন অবান্তর মনে হচ্ছে।
বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে ইংল্যান্ডের যাত্রায় বেলিংহাম অন্যতম প্রধান তারকা হিসেবে আবির্ভূত হয়েছেন। টুর্নামেন্টের সেরা খেলোয়াড়দের তালিকায় তিনি এখন সামনের সারিতে। পানামার বিপক্ষে ২-০ গোলে জয়ের ম্যাচে হ্যারি কেইনের গোলের কারিগর ছিলেন তিনি, নিজে করেছেন চার গোল। যুক্তরাষ্ট্রের মাটিতে ইংল্যান্ডের সমর্থকরা তাকে নিয়ে মেতে উঠেছেন। যদিও নিজেকে নিয়ে তৈরি হওয়া এই উন্মাদনাকে বেশ স্বাভাবিকভাবেই সামলাচ্ছেন ২৩ বছর বয়সী এই তরুণ।
২০১৯ সালে পাদপ্রদীপের আলোয় আসার পর থেকেই তার সাফল্যের পথ ছিল অনেকটা নিশ্চিত। বিবিসি স্পোর্টস তার এই বর্ণাঢ্য উত্থানের পেছনের গল্প তুলে ধরেছে।
অভিষেক থেকেই স্কটদের নজর কেড়েছিলেন বেলিংহাম
২০১৯ সালের আগস্টে নিজের শহর বার্মিংহাম সিটির হয়ে অভিষেক হয় বেলিংহামের। বয়স তখন মাত্র ১৬ বছর ৩৮ দিন। এর মাধ্যমে তিনি ১৯৭০ সালে গড়া ট্রেভর ফ্রান্সিসের রেকর্ড ভেঙে ক্লাবের সর্বকনিষ্ঠ খেলোয়াড় হওয়ার গৌরব অর্জন করেন। প্রিমিয়ার লিগের স্কাউটিং রিপোর্টে তার অসামান্য অ্যাথলেটিসিজম, দীর্ঘ পা, সাবলীল দৌড় এবং পরিশ্রম করার মানসিকতার প্রশংসা করা হয়েছিল। বিশেষ করে চাপের মুখে বল নিয়ন্ত্রণ এবং মাঠের খালি জায়গা খুঁজে বের করার অসাধারণ টেকনিক্যাল দক্ষতায় মুগ্ধ হয়েছিলেন স্কাউটাররা।
পরবর্তীতে ২০২০ সালে ২০.৭ মিলিয়ন পাউন্ডের বিনিময়ে তিনি বরুসিয়া ডর্টমুন্ডে যোগ দেন। বার্মিংহাম সিটি ক্লাবটি তার সম্মানে তাদের ২২ নম্বর জার্সিটিও তুলে রাখে, যদিও তিনি ক্লাবের হয়ে মাত্র ৪৪টি ম্যাচ খেলেছিলেন। ডর্টমুন্ডের জার্সিতেও নিজের প্রথম ম্যাচেই গোল করে তিনি জার্মান ফুটবলে নিজের আগমনী বার্তা দেন।
জাতীয় দলের স্কোয়াডে দ্রুত উত্থান
ইংল্যান্ডের তৎকালীন কোচ গ্যারেথ সাউথগেটের নজর এড়াতে পারেননি বেলিংহাম। ডর্টমুন্ডের হয়ে মাত্র ১১টি ম্যাচ খেলার পরই ১৭ বছর বয়সে তাকে জাতীয় দলে ডেকে নেওয়া হয়। ২০২০ সালের নভেম্বরে রিপাবলিক অব আয়ারল্যান্ডের বিপক্ষে ৩-০ গোলে জয়ের ম্যাচে বদলি খেলোয়াড় হিসেবে তার আন্তর্জাতিক অভিষেক হয়। ইউরো ২০২০-এর ফাইনালে উঠলেও সে সময় সাউথগেট তাকে খুব সাবধানে ব্যবহার করেছিলেন। তবে ২০২২ কাতার বিশ্বকাপ নাগাদ বেলিংহামকে আর আটকে রাখা সম্ভব ছিল না। ইরানের বিপক্ষে ৬-২ ব্যবধানে জয়ের ম্যাচে গোল করে আন্তর্জাতিক মঞ্চে নিজের গোলের খাতা খোলেন তিনি। ইউরো ২০২৪ নাগাদ তিনি জাতীয় দলের অবিচ্ছেদ্য অংশে পরিণত হন।
রিয়াল মাদ্রিদ ‘গ্যালাকটিকো’-র প্রভাব
ইউরো ২০২৪-এর সময় বেলিংহাম রিয়াল মাদ্রিদের হয়ে প্রায় এক বছর কাটিয়ে ফেলেছিলেন। লা লিগা এবং চ্যাম্পিয়নস লিগ জেতা এই ক্লাবের হয়ে তিনি তখন ১৯টি গোল করেছিলেন। টুর্নামেন্টজুড়ে মিডিয়ার প্রধান আকর্ষণে পরিণত হয়েছিলেন তিনি। তবে স্লোভাকিয়ার বিপক্ষে শেষ ষোলোর ম্যাচে তার ওভারহেড কিকের গোলটি টুর্নামেন্টের অন্যতম সেরা মুহূর্ত হিসেবে বিবেচিত হয়।
নির্বাচন নিয়ে অনিশ্চয়তা ও প্রত্যাবর্তন
রিয়াল মাদ্রিদের হয়ে গত মৌসুমের ফর্ম ধরে রাখতে কিছুটা বেগ পেতে হয়েছে বেলিংহামকে। চোটের কারণে মৌসুমের শুরুতে মাঠের বাইরে থাকতে হয়েছিল তাকে। নতুন কোচ থমাস টুখেলের সঙ্গে তার সম্পর্ক নিয়েও নানা গুঞ্জন শোনা গিয়েছিল। অক্টোবরে তাকে জাতীয় দল থেকে বাদ দেওয়া হয়েছিল, যা নিয়ে বেশ আলোচনা হয়েছিল। যদিও রিপোর্টে বলা হয়, বেলিংহাম নিজেই ফিটনেসের দিকে নজর দিতে বিরতি চেয়েছিলেন।
তবে বিশ্বকাপ শুরুর পর থেকে দৃশ্যপট বদলে যেতে শুরু করে। ক্রোয়েশিয়ার বিপক্ষে অসাধারণ সলো গোল এবং পানামার বিপক্ষে গোল করে তিনি নিজের ফর্মে ফেরার প্রমাণ দিয়েছেন। মেক্সিকোর বিপক্ষে ম্যাচে জোড়া গোল করে তিনি দলের জয়ের নায়ক হয়েছেন। বর্তমানে তিনি মাঠের বাইরের মিডিয়া ইন্টারভিউগুলোতে পরিপক্কতা এবং নম্রতার পরিচয় দিচ্ছেন। সতীর্থদের প্রশংসা করা এবং দলীয় কাজকে প্রাধান্য দেওয়া বেলিংহাম এখন ইংল্যান্ড দলের নেতৃত্বের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
মাত্র ২৩ বছর বয়সেই বেলিংহাম বিশ্ব ফুটবলের সবচেয়ে বড় মঞ্চে নিজেকে অপরিহার্য করে তুলেছেন। শনিবার নরওয়ের বিপক্ষে কোয়ার্টার ফাইনালের ম্যাচে নিজের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণের আরও একটি সুযোগ পাচ্ছেন তিনি।
