বিশ্বকাপ জয়ের মিশনে জুড বেলিংহাম: কিংবদন্তিদের উচ্চতায় পৌঁছানোর অপেক্ষায় ইংলিশ তারকা
মেক্সিকো সিটির উচ্চতা থেকে মায়ামির তীব্র গরম ও আর্দ্রতা—সব প্রতিকূলতাকে জয় করে জুড বেলিংহাম যেন ইংল্যান্ডকে ৬০ বছরের অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে বিশ্বকাপ শিরোপা জেতানোর ব্যক্তিগত মিশনে নেমেছেন। ফুটবল বিশ্বকাপে মাঝেমধ্যে এমন সময় আসে যখন কোনো একজন খেলোয়াড় অপ্রতিরোধ্য গতিতে দলের ভাগ্য নিজের কাঁধে তুলে নেন।
ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায়, ১৯৮৬ সালে দিয়েগো ম্যারাডোনা আর্জেন্টিনাকে যেভাবে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন, ২০০২ সালে রোনালদো ব্রাজিলের হয়ে যে পুনর্জন্ম নিয়েছিলেন কিংবা ২০২২ সালে লিওনেল মেসি দোহায় যেভাবে তার ব্যক্তিগত শ্রেষ্ঠত্বের চূড়ান্ত শিখরে পৌঁছেছিলেন, বেলিংহামের বর্তমান ফর্ম অনেকের মনে সেই স্মৃতিই জাগিয়ে তুলছে। যদিও মায়ামির প্রচণ্ড গরমে নরওয়ের বিপক্ষে জোড়া গোল করে ইংল্যান্ডকে জয় এনে দিলেও, কিংবদন্তি হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে বেলিংহামের সামনে এখনো অনেকটা পথ বাকি।
চলমান বিশ্বকাপে মেসির আর্জেন্টিনা সেমিফাইনালে ইংল্যান্ডের বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এছাড়া ফাইনালে স্পেন অথবা কিলিয়ান এমবাপ্পের শক্তিশালী ফ্রান্স দলকে মোকাবিলা করার চ্যালেঞ্জ তো থাকছেই। ১৯৬৬ সালের ৩০ জুলাই আলফ রামসের ইংল্যান্ডের বিশ্বকাপ জয়ের পর থেকে দীর্ঘ এই খরা কাটাতে বিশ্বমানের খেলোয়াড়রা অনেক সময় নিজেদের ইচ্ছাশক্তিকে কাজে লাগান। সাম্প্রতিক ধারাবাহিক পারফরম্যান্স দিয়ে বেলিংহামও সেই সংকেত দিচ্ছেন।
বিশ্বকাপের সেরাদের কাতারে বেলিংহাম
পেলে বা ম্যারাডোনার উচ্চতার সঙ্গে বেলিংহামকে তুলনা করাটা হয়তো এখনই বাড়াবাড়ি হবে, কিন্তু মেক্সিকোর আজটেকা স্টেডিয়াম এবং মায়ামিতে তার ম্যাচ জেতানো পারফরম্যান্স পরিসংখ্যানের বিচারে তাকে এগিয়ে রাখছে। ১৯৮৬ সালের পর প্রথম খেলোয়াড় হিসেবে বিশ্বকাপের টানা দুটি নকআউট ম্যাচে দুই বা তার বেশি গোল করার কৃতিত্ব দেখিয়েছেন বেলিংহাম। মাত্র ২৩ বছর বয়সে তিনি এই কীর্তি গড়েছেন, যা তাকে ১৯৫৮ সালে ১৭ বছর বয়সে ব্রাজিলের হয়ে বিশ্বকাপ জেতা পেলের ঠিক পেছনে বসিয়েছে।
ইংল্যান্ড দলের জার্সি নম্বর ‘১০’ সার্থকভাবে বহন করছেন বেলিংহাম। নরওয়ের বিপক্ষে ম্যাচে তার ব্যক্তিগত পরিসংখ্যান নজরকাড়া—পাঁচটি শট নিয়েছেন, প্রতিপক্ষের বক্সে সর্বোচ্চ ছয়বার বল স্পর্শ করেছেন, আটটি ডুয়েল জিতেছেন এবং চারবার ফাউল আদায় করেছেন। গুরুত্বপূর্ণ সময়ে গোল করার সহজাত ক্ষমতা ইংল্যান্ডের জন্য বড় ভরসার জায়গা।
ইংল্যান্ডের নতুন গেম চেঞ্জার
ইউরো ২০২৪-এ স্লোভাকিয়ার বিপক্ষে ৯৪ মিনিটে করা তার সেই অবিশ্বাস্য ওভারহেড কিক ইংল্যান্ডকে পরাজয়ের লজ্জা থেকে বাঁচিয়েছিল। সেই মুহূর্ত থেকেই বেলিংহাম যেন নিজেকে নতুন করে চিনিয়েছেন। ইংল্যান্ডের হয়ে তার ১২টি গোলের মধ্যে ৯টিই এসেছে বড় টুর্নামেন্টে। গ্যারি লিনেকারের ১৯৮৬ সালের পর কোনো ইংলিশ খেলোয়াড় হিসেবে এক বিশ্বকাপে পেনাল্টি ছাড়া গোল করার রেকর্ডেও তিনি এখন ভাগ বসিয়েছেন। এছাড়া আর্লিং হালান্ডের পর বেলিংহামই এবারের বিশ্বকাপে বাঁ-পা, ডান-পা এবং হেডে গোল করার বিরল কৃতিত্ব দেখিয়েছেন। তার খেলায় এখন পাওয়ার, গতি এবং স্কিলের দারুণ সমন্বয় ফুটে উঠছে।
কিংবদন্তি হওয়ার পথে বেলিংহাম
ক্যারিয়ারের এই পর্যায়ে এসে বেলিংহাম নিজের পারফরম্যান্স এবং দলকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে গেছেন। অতীতে রোনালদো বা মেসির মতো খেলোয়াড়রা চাপের মুখে নিজেদের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করেছেন। বেলিংহামও সেই একই পথে হাঁটছেন। রিয়াল মাদ্রিদে চোটের কারণে কিছুটা পিছিয়ে পড়লেও, কোচ টমাস টুখেল বিশ্বকাপের গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে তার ওপরই আস্থা রেখেছেন। বেলিংহাম সেই আস্থার প্রতিদান দিয়ে চলেছেন।
সেমিফাইনালে মেসি-বেলিংহাম দ্বৈরথ
আটলান্টায় বুধবারের সেমিফাইনালে আর্জেন্টিনার লিওনেল মেসি ও ইংল্যান্ডের জুড বেলিংহামের দ্বৈরথ হতে যাচ্ছে এবারের বিশ্বকাপের সবচেয়ে আকর্ষণীয় লড়াই। ৩৯ বছর বয়সী মেসি আট গোল করে আর্জেন্টিনার অনুপ্রেরণা হয়ে আছেন। অন্যদিকে, বেলিংহাম ইংল্যান্ডের পাওয়ার হাউস হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। এই দুই ‘১০’ নম্বর জার্সির লড়াই শেষ পর্যন্ত নির্ধারণ করে দেবে কারা ফাইনালের মঞ্চে নামবে। সেখানে হয়তো অপেক্ষা করছে স্পেন কিংবা এমবাপ্পের ফ্রান্স। ইংল্যান্ডের শিরোপা খরা কাটাতে এখন বেলিংহামের দিকেই তাকিয়ে পুরো ফুটবল বিশ্ব।
