২০২৬ বিশ্বকাপ থেকে বেলজিয়ামের বিদায়: সোনালি প্রজন্মের শেষ দেখল ফুটবল বিশ্ব
ফুটবলে রূপকথার মতো বিদায় খুব কমই দেখা যায়। ২০২৬ বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে স্পেনের কাছে ২-১ গোলে হেরে যাওয়ার মাধ্যমে বেলজিয়ামের তথাকথিত ‘সোনালি প্রজন্ম’-এর চার সদস্যের আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ার সম্ভবত এখানেই শেষ হলো।
থিবাউট কুর্তোয়া, রোমেলু লুকাকু, কেভিন ডি ব্রুইনা এবং অ্যাক্সেল উইটসেল ২০১৪ সালের ব্রাজিল বিশ্বকাপ থেকে জাতীয় দলের অবিচ্ছেদ্য অংশ ছিলেন। তবে ফুটবলের সবচেয়ে বড় এই ট্রফি জয়ের স্বপ্ন শেষ পর্যন্ত অধরাই থেকে গেল, তাও দলের এক উত্তরসূরির ভুলে।
ম্যাচের দ্বিতীয়ার্ধে ইনজুরির কারণে মাঠ ছাড়েন গোলরক্ষক কুর্তোয়া। তার পরিবর্তে নামা ২৪ বছর বয়সী সেন ল্যামেন্স ৮৮ মিনিটে একটি শট হাত থেকে ফসকে দেন। সেই সুযোগে বল জালে জড়িয়ে জয় নিশ্চিত করেন মিকেল মেরিনো। বিবিসি রেডিও ৫ লাইভে স্টিফেন ওয়ার্নক বলেন, “ল্যামেন্স নিজের নামের প্রতি সুবিচার করতে পারেননি। গত বছর ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের হয়ে এমন ভুল তিনি করেননি, কিন্তু বিশ্বকাপের চাপ ভিন্ন বিষয়।”
পরবর্তী প্রজন্মের সময় আসছে, তবে এই পুরনো তারকাদের বিদায়ের ধরণটি ছিল বেশ হতাশাজনক।
২০১৪ বিশ্বকাপে আলজেরিয়ার বিপক্ষে বেলজিয়ামের সেই দলটি ছিল যেন তারকাখচিত এক দল। কুর্তোয়া, ডি ব্রুইনা, উইটসেল ও লুকাকুর সাথে ছিলেন ইডেন হ্যাজার্ড, মুসা ডেম্বেলে এবং ভিনসেন্ট কোম্পানি। বেঞ্চে ছিলেন ড্রিস মের্টেনস ও মারোয়ান ফেলাইনি। ২০০২ সালের পর প্রথমবার বিশ্বকাপ খেলতে এসে তারা কোয়ার্টার ফাইনাল পর্যন্ত পৌঁছেছিল। এরপর ২০১৮ বিশ্বকাপে সেমিফাইনাল খেলে তৃতীয় স্থান অর্জন করে তারা। তবে ইউরো ২০১৬ ও ২০২০-এর কোয়ার্টার ফাইনালে উঠলেও, ২০২২ কাতার বিশ্বকাপের গ্রুপ পর্ব থেকে বিদায় নিতে হয় তাদের।
অনেকে মনে করেন, এত প্রতিভাবান দলটির আরও বেশি সাফল্য পাওয়া উচিত ছিল। তবে ১২ মিলিয়নের কম জনসংখ্যার একটি দেশের জন্য আন্তর্জাতিক সাফল্য কতটুকু বাস্তবসম্মত ছিল, তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়। স্প্যানিশ ফুটবল সাংবাদিক গিলেম বালাগ বলেন, “সোনালি প্রজন্ম হতে গেলে আপনাদের কিছু সোনা (ট্রফি) জিততে হতো। বেলজিয়ামের প্রত্যাশা অনেক বেড়ে গিয়েছিল। লুকাকু, ডি ব্রুইনা, টিলেমানস ও ট্রোসার্ডের মতো খেলোয়াড়রা ভালো খেলেছেন। গত বিশ্বকাপে তারা তৃতীয় হয়েছিল, যা অনেকেই ভুলে গেছেন। রবার্তো মার্টিনেজ কোচ থাকাকালীন এর চেয়ে বেশি কিছু চাওয়ার ছিল কি না, তা নিয়ে আমার সন্দেহ আছে।”
এই তারকাদের পাশাপাশি লিয়ান্দ্রো ট্রোসার্ড (৩১), ব্র্যান্ডন মেচেল (৩৩), টিমোথি কাস্তেন (৩৩), হ্যান্স ভানাকেন (৩৩) এবং থমাস মুনিয়ের (৩৪) সম্ভবত শেষবারের মতো বিশ্বকাপ খেললেন। ম্যাচের পর বেলজিয়ামের কোচ রুডি গার্সিয়া বলেন, “যারা হয়তো আর জাতীয় দলে ফিরবেন না, তাদের জন্য আমি হতাশ। আমি চেয়েছিলাম এই দলটিকে যতটা সম্ভব এগিয়ে নিতে। আমার প্রবীণ খেলোয়াড়রা আরও একবার শেষ মুহূর্তের জয় পাওয়ার যোগ্য ছিলেন।”
টুর্নামেন্টের শেষ ষোলোতে যুক্তরাষ্ট্রকে ৪-১ গোলে হারানোর আগে কুর্তোয়া বলেছিলেন, “এটি আমাদের জন্য একটি নতুন যুগ। আমাদের এখন তরুণ প্রজন্মের নতুন খেলোয়াড়রা আছে, যারা দারুণ কিছু করতে এবং বেলজিয়ামের ইতিহাসের পাতায় নাম লেখাতে আগ্রহী।”
বর্তমান দলের ১৩ জন খেলোয়াড়ের বয়স ২৫ বা তার নিচে, যা ভবিষ্যতের জন্য আশাব্যঞ্জক। ২৫ বছর বয়সী চার্লস ডি কেটেলারে বিশ্বকাপে বেলজিয়ামের হয়ে যৌথভাবে সর্বোচ্চ গোলদাতা ছিলেন। এছাড়া অধিনায়ক ইউরি টিলেমানস (২৯) ও আমাদু ওনানা (২৪) টুর্নামেন্টে নিজেদের দক্ষতার প্রমাণ দিয়েছেন। জেরেমি ডোকু (২৪) অন্যতম প্রতিভাবান খেলোয়াড় হলেও ম্যানচেস্টার সিটির ফর্ম বিশ্বকাপে ধরে রাখতে পারেননি।
কোচ রুডি গার্সিয়া যোগ করেন, “দলের তরুণরা এখান থেকে শিক্ষা নেবে। আমাদের বিশ্বকাপ অভিযান নিয়ে আমরা গর্বিত হতে পারি। পরাজয় থেকে আমরা শিখি। আমার মনে হয় না আমাদের লজ্জিত হওয়ার কিছু আছে। স্পেনের মতো শক্তিশালী দলের বিপক্ষে আমরা লড়েছি, যদিও ইনজুরির কারণে আমাদের গোলরক্ষক, অধিনায়ক এবং ডি ব্রুইনাকে হারাতে হয়েছে। পরিকল্পনা অনুযায়ী অনেক কিছুই ঘটেনি। বড় ম্যাচে ভুল করলে তার খেসারত দিতেই হয়।”
